হাসিনার ফাঁসি পর্যন্ত আল্লাহ যেন খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখেন: হাসনাত আবদুল্লাহ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৪ বার
হাসিনার ফাঁসি পর্যন্ত আল্লাহ যেন খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখেন: হাসনাত আবদুল্লাহ

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনীতির অস্থির মুহূর্তে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে উত্তাপ–উত্তেজনা আবারও সামনে এসেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে যখন দেশজুড়ে দোয়া, উদ্বেগ ও আলোচনার ঝড়, ঠিক তখনই এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কঠোর ভাষায় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তাঁর বক্তব্য শুধু উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়েনি, দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে নতুন বিতর্ক ও তীব্র প্রতিক্রিয়া।

শনিবার সকালে এনসিপির তিন শীর্ষ নেতা—মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা—বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন, নেন সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার আপডেট। এরপর হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ কঠোর রাজনৈতিক ভাষায় মন্তব্য করেন, যা মুহূর্তেই দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে আলোড়ন তোলে।

হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য আজ সারা দেশের মানুষ দোয়া করছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল শক্তি তাঁর রোগমুক্তির জন্য মোনাজাত করছেন। আমরা দোয়া করি—আল্লাহ যেন তাঁকে জীবিত রাখেন, যতদিন না গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি হাসিনার ফাঁসি কার্যকর হয়।” তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক শত্রুতার অভিজ্ঞতা, আর ছিল দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের আবহ।

বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছেন। সম্প্রতি তাঁর শ্বাসজনিত জটিলতা বাড়ায় গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিএনপি, জাতীয়তাবাদী পরিবার এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলোতে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁকে দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যাচ্ছেন, জানাচ্ছেন খোঁজ–খবর, দিচ্ছেন সমবেদনা ও শুভকামনা।

হাসনাত আব্দুল্লাহ মনে করেন, বেগম জিয়ার সুস্থতা শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর বেঁচে থাকার প্রশ্ন নয়; সেটি দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, অধিকার ও ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতার সঙ্গে জড়িত। তাঁর ভাষায়, “খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন নন, তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক। তাঁর অসুস্থতা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিতে পারে। তাঁর সুস্থতা মানে দেশের গণতান্ত্রিক চেতনার সুস্থতা।”

এমন মন্তব্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জমে থাকা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শাসন ব্যবস্থার সংঘাত এবং শত শত রাজনৈতিক মামলার ইতিহাস। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনায় ব্যাপক সহিংসতা, ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ওপর কঠোর দমন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের স্মৃতি এখনও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই অনেক নেতার কণ্ঠে প্রকাশ পায় ক্ষোভ–বিন্দু; হাসনাতের বক্তব্যের শিকড়ও সেখানেই।

হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেন, শেখ হাসিনা দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, যার পরিণতি হিসেবে তাঁকে “গণহত্যার দায়ে” মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দেশে পরিবর্তিত প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বহু পুরনো অভিযোগ নতুন করে সামনে আসছে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই হাসনাতের বক্তব্যে উঠে এসেছে ‘ফাঁসি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার বেঁচে থাকা’-র আহ্বান, যা রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে।

হাসপাতালের পরিবেশ, খালেদা জিয়ার ঘরোয়া সিসিইউ কক্ষে নিরবতা, চিকিৎসকদের তৎপরতা—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল বেশ ভারী। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এখনও কাটেনি এবং তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পরিবার ও দলের নেতাদের মতে, তাঁর চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে বিশেষায়িত ব্যবস্থার প্রয়োজন, যদিও বর্তমান সরকার–বিরোধী পরিবেশে বিষয়টি জটিল।

এনসিপির তিন নেতার এই সফর শুধু সদিচ্ছার সাক্ষী নয়, দেশের রাজনৈতিক রসায়নেও একাধিক ইঙ্গিত বহন করে। ইতিহাস বলছে, সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছে, যদিও সেই সহমর্মিতা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। হাসনাত আব্দুল্লাহর কটূক্তিমূলক মন্তব্য আবারও মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতির মাঠ এখনো তীব্র বিভাজন ও প্রতিহিংসার ছায়ায় আচ্ছন্ন।

তবে এদিন হাসনাত শুধু কঠোর রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেননি, মানবিক আহ্বানও জানিয়েছেন। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে দোয়ার আবেদন রেখে বলেছেন, “এই দেশের মানুষ গণতন্ত্র ভালোবাসে। তারা জানে, খালেদা জিয়ার সুস্থতা মানে একটি উন্মুক্ত সমাজের সম্ভাবনা। তাই দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে অনুরোধ—খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করুন।” এই আহ্বানটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, বহু মানুষ তাঁদের টাইমলাইনে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় পোস্ট দিচ্ছেন।

দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে ঘিরে যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তা বিরোধী রাজনীতিকে আরও সংগঠিত ও সক্রিয় করতে পারে। আবার সরকার–সমর্থিত মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা উসকে দিতে পারে, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষও দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ দলীয় কর্মী, কেউবা সাধারণ নাগরিক; অনেকের হাতে থাকে কোরআন শরিফ, অনেকে চোখ বন্ধ করে দোয়া করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আরোগ্যের জন্য। দেশের রাজনীতিতে তিনি যে গভীর ছাপ রেখে গেছেন, এই চিত্র তারই প্রতিফলন।

হাসনাত আব্দুল্লাহর কথার মাধ্যমে আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক রেষারেষি, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং দ্বন্দ্ব–সংঘাতের ইতিহাস। রাজনীতির এই উত্তপ্ত পরিবেশে বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য মানুষের উদ্বেগ যেমন বাড়ছে, তেমনই তাঁর দল ও সমর্থকদের আবেগ আরও তীব্র হচ্ছে।

একদিকে হাসপাতালের সিসিইউতে শুয়ে থাকা একজন প্রবীণ নেত্রী, অন্যদিকে রাজনৈতিক উত্তপ্ত ভাষণ—এই দুই বাস্তবতা আজ বাংলাদেশকে দুই মেরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবুও আশা, দেশের রাজনৈতিক নেতারা অন্তত মানবিক সংকটে সহমর্মিতা দেখাবেন, কারণ দেশের মানুষ এখন শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানবিকতার জায়গায় ফিরে আসার অপেক্ষায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত