আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ম্যানেজার গ্রেপ্তার

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ম্যানেজার গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীর শান্ত জনপদে সম্প্রতি আলোড়ন তুলেছে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সেনবাগ ও দত্তেরহাট শাখায় সংঘটিত এক কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা। সরকারি সেবাখাতের আস্থা ও নির্ভরতার জায়গায় থাকা এ ব্যাংকের দুই শাখা থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বহুদিন ধরে পলাতক ছিলেন শাখা ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন। অবশেষে শনিবার রাতে চট্টগ্রামের একটি বাসা থেকে র‍্যাব-১১ তাকে গ্রেপ্তার করে। রোববার দুপুরে তাকে দুদকের নোয়াখালী কার্যালয়ের তদন্ত টিমের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময়ের অনুসন্ধান, নজরদারি এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার যৌথ তৎপরতার ফলেই এই গ্রেপ্তার সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

এই মামলা শুধু ব্যাংক জালিয়াতির একটি ঘটনা নয়; বরং এটি ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, আলমগীর হোসেন বহুদিন ধরে ব্যাংকের অফিসিয়াল ক্ষমতা ব্যবহার করে ভুয়া নামে-বেনামে ঋণ অনুমোদন করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব গ্রাহকের নামে ঋণ খোলা হয়েছিল, তাদের অনেকের বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অসংখ্য মোবাইল নম্বর। এমনকি প্রকৃত গ্রাহকদের না জানিয়ে তাদের নামে ঋণ সৃষ্টি করে সেই টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে তিনি ব্যাংকের সেনবাগ ও দত্তেরহাট শাখা থেকে মোট ১০ কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দুদকের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট গত ২০ অক্টোবর ব্যাংকের রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে এবং নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে বেশ কিছু অসঙ্গতি চিহ্নিত করে। ঋণের আবেদনপত্র, দলিল, এনআইডি নম্বর ও মোবাইল নম্বর পরীক্ষা করে দেখা যায়, এগুলোর একটি বড় অংশই জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও দুদকের অনুসন্ধানের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। এতে পরিষ্কার হয় যে, দীর্ঘদিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন আলমগীর হোসেন। অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক নোয়াখালী স্পেশাল সিনিয়র জজ আদালতে পৃথক দুটি মামলা করে, যেখানে মোট প্রায় ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

এ ঘটনায় দুদক নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফারুক আহমেদ জানান, প্রাথমিকভাবে সাত কোটি টাকার অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও পরবর্তী তদন্তে আত্মসাতের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে এটি ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকায় পৌঁছে যায় এবং দুটি মামলার সবকটিই আলমগীরের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তথ্য উপস্থাপন করে। গ্রেপ্তারের পর রোববার দুপুরেই তাকে আদালতে হাজির করা হয় এবং বিচারক তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এ ধরনের আর্থিক জালিয়াতি শুধু একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও বিশ্বাসের ওপর বড় ধরনের আঘাত। বিশেষ করে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করা মানবিক ও নৈতিকতার দৃষ্টিতেও একটি ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যাংকে থাকা সরকারি ও ভাতা-ভিত্তিক গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল যে কর্মকর্তার, তিনিই সেই দুর্বলতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নোয়াখালী জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সুজন মিয়া জানান, তাদের সদস্যদের নামে ঋণ তৈরি করে সেই অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তদন্তেই প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও দুদকের অনুসন্ধান দুই জায়গাতেই একই তথ্য উঠে আসে। এ কারণে র‍্যাব ও দুদকের সহযোগিতায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তার মতে, এ ঘটনার ফলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং বাহিনীর সদস্যদের মানসিক ক্ষতিও হয়েছে, কারণ তাদের পরিচয় ব্যবহার করে এমন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

এদিকে স্থানীয়ভাবে এই ঘটনার পর ব্যাংক গ্রাহক ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই জানেন না, তাদের নামে আদৌ কোনো ঋণ রয়েছে কি না। কেউ কেউ ব্যাংকে গিয়েও খোঁজ নিয়েছেন, কারণ তারা আশঙ্কা করছেন, তাদের অজান্তে ঋণ তোলা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকের শাখাগুলোয় নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের হিসাব যাচাইয়ের সুযোগ দিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও শাখাগুলো পুনর্বিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট নথি আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।

শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের বিভিন্ন খাতে এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা নতুন নয়। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে ব্যক্তিগত লোভ, পেশাগত দায়িত্ব থেকে বিচ্যুতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ। আলমগীর হোসেনের গ্রেপ্তার তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—দুর্নীতি যেভাবেই সংঘটিত হোক না কেন, আইনের আওতায় আনা হবে অপরাধীকে। দুদক কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই মামলায় কঠোর পদক্ষেপ ভবিষ্যতে দুর্নীতিবাজদের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে উঠবে।

মামলার অগ্রগতি এখন দ্রুত এগোচ্ছে। গ্রেপ্তারির পর জিজ্ঞাসাবাদে আরও নতুন তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক তদন্ত টিম। তারা ব্যাংকের রেকর্ড, আর্থিক প্রতিবেদন, অনুমোদিত ঋণের নথি ও গ্রাহকদের তথ্য পুনরায় যাচাই করছে। তদন্ত শেষ হলে আদালতে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। এর পাশাপাশি গৃহীত ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে, কোথায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে, সব বিষয়ই পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে নোয়াখালীতে আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের এই জালিয়াতি মামলা শুধু একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, বরং এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনে দিয়েছে। আলমগীর হোসেনের গ্রেপ্তার তার ব্যক্তিগত অপরাধের জবাবদিহির পথ তৈরি করেছে। এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করছে, আত্মসাৎ করা কোটি কোটি টাকার অর্থের প্রকৃত চিত্র উদঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা কতটা কার্যকরভাবে সম্ভব হবে।

র‍্যাব ও দুদকের দ্রুত তৎপরতা এই মামলায় একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেশের মানুষ অপেক্ষা করছে—দীর্ঘ তদন্ত ও প্রমাণ সংগ্রহের পর আদালতের মাধ্যমে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত