প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সদ্য প্রকাশিত মাসিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণের এমন বৃদ্ধিকে অনেকেই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চক্রের অংশ হিসেবে দেখলেও, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, ডলারের চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বল প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনায় নিলে এটি অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
প্রতিবেদনটি সোমবার সকালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে নেওয়া ঋণের প্রবণতা, ব্যাংকিং খাতে আমানত বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ, মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক চিত্র এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, সরকারের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় ঘাটতি পূরণের জন্য ধার নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বর্ধিত চাহিদা মেটাতে সরকার ব্যাংক ও অ-ব্যাংক উভয়খাত থেকেই বেশি হারে ঋণ গ্রহণ করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকে মোট আমানত বাড়লেও তার সুফল তেমনভাবে বেসরকারি খাতে পৌঁছায়নি। অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই খাতে ঋণ বিতরণ প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন উদ্যোক্তারা। তারা মনে করেন, বাজারে তারল্য সংকট, ডলার–সংকটজনিত আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির মতো বিষয়গুলো ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যখন বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় ব্যাংকগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিতে বেশি ঝুঁকে পড়ে, ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রাপ্তিসাধ্য ঋণ কমে যায়। এরই ফলস্বরূপ সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ দুর্বল রয়ে গেছে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক গতিশীলতাকে মন্থর করে দিতে পারে। ভোক্তা চাহিদা, উৎপাদন ও বিনিয়োগে এর প্রভাব কয়েক মাসের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতের বড় প্রকল্পগুলোতে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও কিছুটা চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক উন্নয়ন অংশীদার তাদের সহায়তা কাঠামো পুনর্বিবেচনা করছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও সুদের হারের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে বিদেশি ঋণের পরিশোধ ব্যয়ও বেড়েছে, যা সরকারের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম বিশেষভাবে বেড়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি, মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনে খরচ বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বাজারের অস্থিরতা এবং পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা কমাতে সরকার বিভিন্ন ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মসূচি সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ভর্তুকি ও সামাজিক বরাদ্দই আবার সরকারের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমছে না।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সরকার এমন এক আর্থিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে যেখানে ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হচ্ছে না। এর ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো তাৎক্ষণিক বিকল্প নেই। তিনি আরও জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে এবং আমদানি ব্যয় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমে আসবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধুই বৈশ্বিক অস্থিরতায় দায়ী করা সঠিক হবে না। তারা মনে করেন, দেশের ভেতরেও কর আদায় ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যাংকিং খাতের তদারকি এবং আর্থিক সুশাসন নিয়ে কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা রয়েছে, যা সমাধান না হলে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। তাদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, শিল্পায়ন বৃদ্ধির জন্য নীতি-সহায়তা—এসব উদ্যোগই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তারল্য সংকট কমানো, ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং ডলারের বাজার স্বাভাবিক করা ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। অনেক উদ্যোক্তা লক্ষ্য করছেন, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তাদের নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে এবং অনেকেই অপেক্ষমাণ অবস্থায় আছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, সরকার ভবিষ্যতে কিছু বড় প্রকল্পে ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন এবং অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করলে একদিকে বাজেট ঘাটতি কমবে, অন্যদিকে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
যদিও সরকারের বাড়তি ঋণ নিয়ে নানামুখী উদ্বেগ রয়েছে, তবুও অর্থনীতির ইতিবাচক দিকগুলোও উল্লেখ করেছেন প্রতিবেদকেরা। ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধি মানুষ ও ব্যবসা–প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। রপ্তানি আয়ের কিছু খাতেও উন্নতির বার্তা পাওয়া গেছে, যা অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করতে পারে। তবে এই ইতিবাচক দিকগুলোকে বজায় রাখতে হলে নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি সুষম এবং স্থায়ী আর্থিক কাঠামো তৈরি করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে এবং আর্থিক সুশাসন শক্তিশালী করা গেলে বর্তমান চাপ কমানো সম্ভব। তারা চান, সরকারের ঋণ বৃদ্ধি নিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি মোকাবিলায় পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ হোক। কারণ অর্থনীতির প্রতিটি খাতই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, এবং কোনো খাতে দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব সবখানেই পড়ে।
সেপ্টেম্বরে সরকারের ঋণ বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা হলেও, এটিকে ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা যাবে না—বিশ্লেষকেরা এমনই মন্তব্য করছেন। তবে তারা বলছেন, এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ঋণের মাত্রা আর্থিক ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিমালা সংশোধন ও কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।