বিশ্ব এইডস দিবস ২০২৫: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে নতুন দিগন্ত গড়ার প্রত্যয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৮ বার
বিশ্ব এইডস দিবস ২০২৫: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে নতুন দিগন্ত গড়ার প্রত্যয়

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রতি বছর ১লা ডিসেম্বর পালিত হয় বিশ্ব এইডস দিবস, যা শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়, বরং মানবতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ও সহানুভূতির প্রতীক। এই দিনে আমরা স্মরণ করি সেই সব মানুষকে, যাদের এইচআইভি/এইডসের কারণে আমরা হারিয়েছি, এবং যারা এখনও এই রোগ নিয়ে লড়াই করছেন, তাদের প্রতি সমর্থন এবং সহমর্মিতা প্রকাশ করি।

২০২৫ সালের বিশ্ব এইডস দিবসের মূল বার্তা হলো ‘চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে, নতুনভাবে এইডস প্রতিরোধ গড়ে তোলা’। বার্তাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং স্বাস্থ্য খাতে অর্থের ঘাটতি আমাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে একই বার্তা আশার দিকটিও দেখায়। আমরা চাইলে আরও শক্তিশালী, টেকসই এবং আধুনিক এইডস প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারি। এটি শুধু চিকিৎসা বা গবেষণার বিষয় নয়, বরং সমাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমান সুযোগ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে ছিলেন। একই বছরে ১৩ লাখ নতুন সংক্রমণ এবং প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এইডস-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও এই সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তবুও এখনও প্রায় ৯২ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে বৈশ্বিক অগ্রগতি সত্ত্বেও, সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিশু, কিশোর-কিশোরী, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বলা যায় সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা প্রয়োজন। এ থেকে বোঝা যায় যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনও এই রোগ প্রতিরোধের অন্যতম বড় বাধা। স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা যদি সমানভাবে পৌঁছানো যায়, তবেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।

২০২৫ সালে এইচআইভি/এইডসের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে নতুন ধারা শুরু হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশন ভিত্তিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ এখন অনেকের জন্য সহজ ও টেকসই চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণে অসুবিধা থাকলেও রোগীর জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে। পাশাপাশি নতুন গবেষণা মডেলগুলো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণের হার নির্ধারণে আরও কার্যকর হচ্ছে। ফলে স্থানীয় এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলো আরও সুসংগতভাবে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ অগ্রগতিকে আটকে দিতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন আরও কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সমান স্বাস্থ্যসেবা। ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যে অর্থ হচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষ জানবে তাদের এইচআইভি স্ট্যাটাস, ৯৫ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা পাবেন এবং ৯৫ শতাংশ চিকিৎসাধীন রোগী ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবেন।

বিশ্ব এইডস দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞান, গবেষণা ও সচেতনতার কারণে আমরা অনেক অর্জন করেছি। তবে যদি সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করি, বৈষম্য দূর না করি, তাহলে আমাদের অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থাকবে। এইডস মোকাবিলা শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, এটি মানবিক অধিকার, ন্যায়, সমতা এবং মর্যাদার বিষয়। প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সমানভাবে পৌঁছানো হলে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন সম্ভব।

এই দিনে আমরা সেইসব মানুষকে স্মরণ করি, যারা আর আমাদের মাঝে নেই। যারা এইচআইভি নিয়ে লড়াই করছেন, তাদের পাশে দাঁড়াই। শুধু প্রার্থনা নয়, সমাজ এবং পরিবারে সমর্থন ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একক প্রচেষ্টা পর্যাপ্ত নয়; একসঙ্গে কাজ করলে সমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বাংলাদেশেও এই দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সচেতনতা বৃদ্ধি, পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং রোগীদের চিকিৎসার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক, সমাজকর্মী এবং ভলেন্টিয়াররা একযোগে কাজ করছেন। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতা কর্মসূচি, মেডিকেল ক্যাম্প ও তথ্য সেশনগুলো নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হচ্ছে।

২০২৫ সালের এই বিশ্ব এইডস দিবস আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—অগ্রগতি হয়েছে, তবে চূড়ান্ত বিজয় এখনও অর্জিত হয়নি। এটি আমাদেরকে সতর্ক করে দেয় যে বৈষম্য, অর্থনৈতিক সংকট এবং সমাজের অবহেলা এখনও সংক্রমণকে বাড়াচ্ছে। তাই চিকিৎসা, সচেতনতা এবং মানবিক সহমর্মিতার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এইডস মুক্ত সমাজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব।

শেষকথা, এই দিনে আমরা প্রতিজ্ঞা করি যে একসঙ্গে কাজ করে, মানবিক মূল্যবোধ এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সমন্বয়ে আমরা একদিন এইডস-মুক্ত পৃথিবী গড়তে পারব। বিশ্ব এইডস দিবস শুধু স্মরণ এবং প্রার্থনার দিন নয়; এটি একটি আহ্বান, একটি প্রেরণা, যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষ সচেতন থাকে, সমর্থন দেয় এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত