কিশোরগঞ্জে বাড়ির উঠান থেকে শিশুকে টেনে নিল শিয়াল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
কিশোরগঞ্জে বাড়ির উঠান থেকে শিশুকে টেনে নিল শিয়াল

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নের পুঁথিপাড়া গ্রামে ঘটে গেছে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। বাড়ির উঠানে খেলতে থাকা মাত্র দুই বছর বয়সী শিশু হুমাইরা আক্তারকে হঠাৎ করে টেনে নিয়ে যায় একটি শিয়াল। পরিবারের সদস্যরা বুঝে ওঠার আগেই শিয়ালের আক্রমণে প্রাণ হারায় এই নিষ্পাপ শিশু। সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক ও আতঙ্ক।

হুমাইরা ছিলেন পুঁথিপাড়া এলাকার অটোরিকশা চালক হুমায়ুন কবিরের চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট এবং সবার আদরের। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে অসহায় কান্নায় ভেঙে পড়েন হুমায়ুন। তিনি বলেন, হুমাইরা তার চাচা গোলাম মোস্তফার ঘর থেকে খেলাধুলা করে নিজেদের ঘরের দিকে ফিরছিল। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করেছিল। পরিবারের কেউ বুঝে ওঠার আগেই একটি শিয়াল হঠাৎ বেরিয়ে এসে শিশুটিকে টেনে নিয়ে যায়। তারা চিৎকার করে ছুটে গেলেও শিশুটিকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর বাড়ির অদূরে ঝোপের ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয় হুমাইরার নিথর দেহ।

শিশুটির ভাবি মর্তুজা বেগম জানান, ঘটনার আগে সন্ধ্যার নামাজের পর ঘরের সামনে দিয়ে দুটি শিয়াল যেতে দেখেছিলেন তিনি। তখনও তিনি ভাবেননি যে এমন ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে। তিনি বলেন, হুমাইরার শরীরের বিভিন্ন স্থানে শিয়ালের কামড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এমন নির্মমতা ভাবতেই কষ্ট হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল জানান, এলাকায় পূর্বেও শিয়ালের আক্রমণ ঘটেছে। বছরখানেক আগে একই ইউনিয়নে আরেকটি দুই বছর বয়সী শিশু শিয়ালের আক্রমণে মারা গিয়েছিল। আগে গ্রামটিতে ঘন বনজঙ্গল, আখখেত ও ঝোপঝাড় ছিল, যেখানে শিয়াল স্বাভাবিকভাবে খাদ্য পেত। কিন্তু কৃষিজমির পরিবর্তন, জঙ্গল কমে যাওয়া এবং মানুষের বসতি বেড়ে যাওয়ার কারণে শিয়ালের খাদ্যাভ্যাসে বিপর্যয় ঘটেছে। ফলে তারা এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং মানুষের ওপর আক্রমণ করছে। তার মতে, পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গ্রামের মানুষের কাছে এ ঘটনা নতুন নয়। মাত্র কয়েক মাস আগে পার্শ্ববর্তী তেরহাসিয়া গ্রামে একই ধরনের আরেকটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় দুই বছর বয়সী শিশু আরাফ। সেদিনও বাড়ির উঠান থেকে শিশুটিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল শিয়াল, পরে বাড়ির পাশেই তার মরদেহ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, আর তার মাশুল দিচ্ছে মানুষ।

হুমাইরার মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কেউ কল্পনাও করতে পারছে না যে একটি শিয়াল মানুষের বাড়ির উঠান পর্যন্ত উঠে এসে শিশুদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। গ্রামের নারীরা সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন, আর শিশুদের একা বাইরে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে।

এদিকে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শিয়ালের উপদ্রব কমাতে এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং গ্রামবাসীকে নিয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা। প্রাণহানি রোধে এলাকায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আমরা দ্রুত উদ্যোগ নিচ্ছি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল নষ্ট হলে এমন ঘটনাই বেড়ে যায়। খাদ্যসংকটে পড়া শিয়াল ও অন্যান্য প্রাণীরা স্বভাববিরুদ্ধ আচরণ করে মানুষের বসতিতে চলে আসে। এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত পরিবেশ সংরক্ষণ, বনজঙ্গল পুনরুদ্ধার এবং মানব-বন্যপ্রাণী সহাবস্থানের সচেতনতার ওপর জোর দেওয়া।

হুমাইরার পরিবার এখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ এভাবে ঝরে যাওয়ার ঘটনার পর পুরো গ্রামই স্তব্ধ। হুমাইরার মা-বাবার মুখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন—“এভাবেই কি আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে?”

এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারে না ঘটে, এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত