প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আবারও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশে ৫৬৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর প্রভাব এখনও শক্তিশালী। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, বরিশাল বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৫১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৮২ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৯৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১২৭ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮৮ জন, খুলনা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৪৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৪৫ জন, রাজশাহী বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩০ জন, রংপুর বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩ জন এবং সিলেট বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরে একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৩,১৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯৫,৫৭৭ জন। এই আক্রান্তের মধ্যে ৬২.৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৬ শতাংশ নারী।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা এখনও উদ্বেগজনক। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩৮৬ জন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও মশা নিধন কার্যক্রম ছাড়া ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগী সাময়িকভাবে কম হলেও আবারও প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে, বিশেষ করে শীত মৌসুমে যেখান থেকে জল জমে থাকা অবস্থায় মশার লার্ভা জন্মায়। তাই শহর ও গ্রামের স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নাগরিকদের মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর গত বছরের তুলনায় এই বছর আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও মৃত্যুর হার এখনও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে দেশে মোট ১,১১,২১৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পর্যাপ্ত সতর্কতা না নিলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত স্প্রে, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ব্যক্তিগত সতর্কতা গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করে ঘরে ও আশপাশে কোনো স্থানে জল জমে থাকলে তা মশার প্রজনন স্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা এবং বসত এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
প্রতিবছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বেড়ে যায়। তবে ২০২৫ সালে দেখা যাচ্ছে, শীতের শুরুতে পর্যন্ত নতুন আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, যা অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসা প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। অনিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্রে রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ যেমন উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, পেশীতে ব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে অবিলম্বে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং অন্যান্য ক্রনিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রোগটি আরও বিপজ্জনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকারের স্বাস্থ্য সংস্থা, জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা জরুরি। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, লার্ভা ধ্বংসে নিয়মিত স্প্রে ব্যবহার, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কভার করা পানি সংরক্ষণ এবং মশার কামড় প্রতিরোধক ব্যবহার করতে হবে।
চিকিৎসকরা আরও জানাচ্ছেন, ডেঙ্গুর সময় যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া না হলে রোগী দ্রুত শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করতে পারে। তাই রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ অপরিহার্য।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রতি বছরকার প্রাদুর্ভাবের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি চালানো হয়। তবে সঠিক তথ্য এবং জনসচেতনতা না থাকায় রোগীদের সংখ্যা নিয়মিতভাবে বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে সকলের দায়িত্ব বেড়ে গেছে, যাতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় এবং মৃত্যুর হার কমানো যায়।