প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দ্রুতগতির একটি পাথরবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় জহিরুল ইসলাম নামের এক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) রাত ৮টার দিকে তেঁতুলিয়া–বাংলাবান্ধা মহাসড়কের তিরনইহাট ইউনিয়নের খয়খাটপাড়া এলাকায় ঘটে এই দুর্ঘটনা। অন্ধকার নেমে আসা সন্ধ্যার পর মহাসড়কে ব্যস্ততা কিছুটা বাড়লেও পর্যাপ্ত আলো না থাকায় এবং যানবাহনের দ্রুতগতির কারণে ওই এলাকায় প্রায়ই ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই ঝুঁকিই শেষমেশ কেড়ে নিল এক পরিশ্রমী শ্রমিকের প্রাণ।
নিহত জহিরুল ইসলাম তেঁতুলিয়ার দরগাসিং গ্রামের মৃত আমের আলীর ছেলে। পাথর–বালু লোডিংয়ের শ্রমিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলেন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি খয়খাটপাড়া এলাকায় একটি ট্রাকে পাথর-বালু লোড করছিলেন। কাজ শেষ করে ট্রাকটি মহাসড়কে তোলার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগন্যাল দিচ্ছিলেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাবান্ধার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে আসা আরেকটি পাথরবোঝাই ট্রাক তাকে সজোরে ধাক্কা মারে।
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, জহিরুল ট্রাককে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে হাতের ইশারায় সংকেত দিচ্ছিলেন। তাঁর সামনে দিয়ে ট্রাকটি উঠতে ছিল। কিন্তু দ্রুতগতির আরেকটি ট্রাক হঠাৎ পাশ থেকে এসে তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। ধাক্কার শব্দে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে চাপা দেওয়া ট্রাকটি আটক করলেও চালক ট্রাক ছেড়ে পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত জহিরুলকে দ্রুত উদ্ধার করে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তাঁর মাথা, বুকে এবং পায়ে গুরুতর আঘাত লাগায় বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
তেঁতুলিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেবাশীষ রায় গণমাধ্যমকে দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য এবং প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, অতিরিক্ত গতিই দুর্ঘটনার মূল কারণ। ট্রাকচালক পালিয়ে গেলেও আটক করা ট্রাকটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইনে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, এলাকাটি পাথর পরিবহনের কারণে সবসময় ব্যস্ত থাকে, এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
জহিরুলের বাড়িতে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর পরিবার জানায়, তিনি প্রতিনিয়ত পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন। স্ত্রী, দুই সন্তান এবং বৃদ্ধ মা–বাবা নিয়ে চলছিল তাঁর সংসার। তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় পতিত। প্রতিবেশীরা বলেন, জহিরুল শান্ত-স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। কাজের প্রতি আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার কারণে সহকর্মীদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধা মহাসড়কে পাথরবোঝাই ট্রাকগুলোর বেপরোয়া চলাচল আটকানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাতে দ্রুতগতিতে ভারী যানবাহন চলাচল করায় শ্রমিক, পথচারী ও স্থানীয়দের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা জানান, নিয়মিত নজরদারি না থাকায় ট্রাকচালকদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অনেক চালক লাইসেন্স ছাড়া বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই এসব ভারী যানবাহন চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়লেও তারা আবারও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন—ক্ষতি শুধু জহিরুলের পরিবারের, যাকে আর কোনোদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তার সহকর্মীরা বলেন, পাথর-বালুর কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও জীবিকার তাগিদে তারা প্রতিনিয়ত এই ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে যান। তাদের মতে, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ এবং প্রশাসন উভয়কেই আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
এদিকে পরিবার ও সহকর্মীরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে তারা মহাসড়কে অতিরিক্ত গতির ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান।
জহিরুল ইসলামের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির আরেকটি নির্মম উদাহরণ। প্রতিদিনের শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলো নিরাপদ সড়কের অভাবে কত সহজেই ঝরে যাচ্ছে জীবন—তারই প্রতিফলন এই ঘটনা। স্থানীয়রা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর না ঘটে।