প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রিমিয়ার লিগে প্রতিটি ম্যাচই উত্তেজনাপূর্ণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে কিছু ম্যাচ আছে যা শুধু জয়-পরাজয়ের গল্প বলে না, বরং রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা আর নিখুঁত ফুটবল দক্ষতার মিলন ঘটিয়ে দর্শকদের স্মৃতিতে জায়গা করে নেয় বছরের পর বছর। ক্রাভেন কটেজে মঙ্গলবার রাতের নবগোলের পাগলাটে লড়াই ছিল সেরকমই একটি ম্যাচ। যেখানে ফুলহ্যাম ও ম্যানচেস্টার সিটি মিলে তৈরি করল এক ফুটবলীয় নাটক, যার শেষ পরিণতি সিটিজেনদের ৫–৪ গোলের জয়। এই ম্যাচে রেকর্ড গড়লেন আর্লিং হলান্ড, উজ্জ্বল ছিলেন ফিল ফোডেন, আর ফুলহ্যামের লড়াইও ছিল প্রশংসনীয়।
ম্যাচ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। প্রিমিয়ার লিগে শততম গোলের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র একটি গোল। মাত্র ২০ মিনিটেই সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন তিনি। বাঁ দিক থেকে জেরেমি ডোকুর বাড়ানো পাস পেনাল্টি স্পটের কাছে পেয়ে এক টাচে নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান হলান্ড। এই গোলের মাধ্যমে ১১১ ম্যাচে ১০০ গোল করে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি করা খেলোয়াড় বনে যান তিনি। অ্যালান শিয়েরারের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে যেন নিজের সাম্রাজ্যের সীমা আরও বাড়িয়ে দিলেন সিটির এই মহাতারকা।
গোলের পর সিটি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণের কেন্দ্রে ছিলেন হলান্ড। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের চাপের মধ্যেও সুচিন্তিত পাসে সহায়তা করতে থাকেন তিনি। দ্বিতীয় গোলেও তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক ডিফেন্ডারের ভিড়ের ভেতর থেকে অসাধারণ থ্রু পাস বাড়ান এই নরওয়েজিয়ান ফরোয়ার্ড। বল পেয়ে ডি-বক্সে ঢুকে নিখুঁত চিপ শটে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে জাল খুঁজে নেন ডাচ মিডফিল্ডার তিজান্নি রেইন্ডার্স। সিটির লিড তখন দ্বিগুণ।
৪৪ মিনিটে ফিল ফোডেনের অসাধারণ দূরপাল্লার শটে সিটির লিড বেড়ে দাঁড়ায় তিন গোলে। যদিও প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এমিল স্মিথ রো হেডে গোল করে একবার ব্যবধান কমান, তবু বিরতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেই ড্রেসিংরুমে ফেরে সিটি।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আবারও গোলের দেখা মেলে। ডি-বক্সে সতীর্থের বাড়ানো বল পেয়ে ব্যাক হিলের অনবদ্য ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ফোডেন। শেষ দুই ম্যাচে চার গোল করে যেন নিজের সেরা সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ইংলিশ এই তরুণ ফরোয়ার্ড।
সিটির পঞ্চম গোল আসে ৫৪ মিনিটে, যদিও সেটি ছিল আত্মঘাতী। জেরেমি ডোকুর শট ফুলহ্যামের বার্জের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে ঠেকে। স্কোরলাইন তখন ৫–১, সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি একপেশে হয়ে যাবে। কিন্তু ফুটবলের অদ্ভুত অনিশ্চয়তা আবারও প্রমাণ করে দিল ফুলহ্যাম। ব্যাকলাইনে টিম স্পিরিট, মাঝমাঠে চাপ এবং আক্রমণে দারুণ দক্ষতার কারণে ম্যাচে নাটকীয়তা ফিরে আসে।
৫৭ মিনিটে অ্যালেক্স আইওবি গোল করে ব্যবধান ৫–২ করেন। এই গোলের পর ফুলহ্যাম যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। দর্শকেরা চিৎকার করে তাদের উজ্জীবিত করতে থাকে। ৭২ মিনিটে সামুয়েল চুকওয়েজের গোল এবং তার মাত্র ছয় মিনিট পর আরেকটি গোল ম্যাচে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি এনে দেয়। স্কোরলাইন তখন ৫–৪, আর সিটি হঠাৎই চাপের মুখে পড়ে। ৫–১ থেকে ফিরে এসে ম্যাচে লড়াই জমিয়ে তোলার অসাধারণ দৃঢ়তা দেখায় ফুলহ্যাম।
শেষ সময়টা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। ফুলহ্যাম সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণে যায়, একের পর এক বল সিটির ডি-বক্সে উঠতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিটির রক্ষণপ্রাচীর ভাঙতে পারেনি স্বাগতিকরা। গোলরক্ষকের বীরত্ব, ডিফেন্ডারদের শারীরিক সক্ষমতা এবং শেষ মুহূর্তে দলের ধৈর্য ম্যাচটিকে সিটির দিকেই নিয়ে যায়।
এই জয়ে ১৪ ম্যাচ শেষে ৯ জয় ও ১ ড্রয়ে ২৮ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে উঠে এসেছে ম্যানচেস্টার সিটি। এক ম্যাচ কম খেলা আর্সেনালের পয়েন্ট ৩০। ফলে শীর্ষে ওঠার সুযোগ এখনও জাগিয়ে রেখেছে সিটিজেনরা। অন্যদিকে, ১৭ পয়েন্ট নিয়ে ১৫তম স্থানে রয়েছে ফুলহ্যাম। যদিও পয়েন্ট টেবিলে অবস্থান নড়বড়ে, তবু এই ম্যাচে তাদের লড়াই ফুটবলবিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হলান্ডের রেকর্ড শততম গোল, ফোডেনের দুর্দান্ত ফর্ম, ডোকুর গতিময়তা, ফুলহ্যামের অনবদ্য প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে ম্যাচটি ছিল প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। দর্শক, বিশ্লেষক ও সমর্থকরা বলতেই পারেন, এটি শুধু জয়ের গল্প নয়, এটি ফুটবলের গল্প—যেখানে কখনোই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছু বলা যায় না।