প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সুদৃঢ় করার জন্য অপরিহার্য। আর সে লক্ষ্য পূরণে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং এতে গণমাধ্যমের সঠিক তথ্যপ্রবাহ, সাহসী অনুসন্ধান ও দায়িত্বশীল প্রতিবেদনের কোনো বিকল্প নেই। দেশের স্বার্থে একটি ভালো নির্বাচনের প্রত্যাশা এখন সকলেরই, আর এই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে গণমাধ্যমই জনগণ ও কমিশনের মাঝে সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করবে।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকার নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সাংবাদিকদের জন্য আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা। সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে কমিশনার সানাউল্লাহ বিগত দেড় দশকে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিয়ম ও বিতর্কিত ঘটনাগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। এই আস্থা পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়, বরং রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমসহ সকল পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু ভোট গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে ভোট গণনা—সবকিছুতেই গঠনমূলক নজরদারি করতে পারে গণমাধ্যম। তাই সাংবাদিকদের এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হচ্ছে তাদেরকে নির্বাচন সংক্রান্ত আইন, আচরণবিধি ও তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি আরও শক্তিশালীভাবে বোঝানো, যাতে তারা স্বচ্ছ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করতে পারেন।
কমিশনার সানাউল্লাহ আরও উল্লেখ করেন, এবারের নির্বাচনে প্রতিটি ভোটার গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন মিনিট সময় ব্যয় করছেন দুই ভোট একসঙ্গে দিতে। নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, নির্বাচনকালে সংবাদমাধ্যমের অবাধ বিচরণ, নিরাপত্তা ও তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। তার বক্তব্যে উঠে আসে গণমাধ্যমের প্রতি গভীর আস্থার প্রকাশ, যা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরো নির্বাচন কমিশন এখন প্রস্তুতির জোয়ারে। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি মানসম্মত ও সফল নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিনি আরও দাবি করেন, শতাব্দীর সেরা নির্বাচন আয়োজনের স্বপ্ন নিয়েই ইসি কাজ করছে, এবং এই লক্ষ্যে প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সর্বোচ্চ সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন সবসময়ই জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু গত কয়েকটি নির্বাচনে নানা অভিযোগ, সহিংসতা ও অনিয়মের কারণে জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও হতাশা তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য, এবং বাংলাদেশেও এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম ভোটারদের তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে, অনিয়ম তদন্ত করে এবং ভোটারদের সচেতন করে। তাই নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যমকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে এবং তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজনের মধ্য দিয়েই সেই গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।
স্বচ্ছ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার অন্যতম শর্ত। এ কারণে কমিশনার সানাউল্লাহ মনে করেন, এ বছরের নির্বাচন আয়োজন একটি চ্যালেঞ্জ হলেও এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ। তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় নির্বাচন কমিশনের একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে নিরপেক্ষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনগণের কাছে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা। কোনো গুজব বা ভুল তথ্য ছড়ানোর পরিবর্তে যাচাই করা তথ্যই জনগণের সামনে উপস্থাপন করা জরুরি। নির্বাচনকালে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বা ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠলেও কমিশনারের এই আশ্বাস সাংবাদিকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও বেশ বড়। তারা চায় অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত একটি নির্বাচন। ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশ, ফলাফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সততার প্রত্যাশা এখনও প্রবল। নির্বাচন কমিশন যদি সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যমের সহযোগিতা গ্রহণ করে, তাহলে অনিয়মের ঘটনা কমে আসবে এবং ভোটারদের আস্থা কিছুটা হলেও ফিরে আসবে—এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
শেষ পর্যন্ত একটি ভালো নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের সাহসী ভূমিকা। এই তিনটির সমন্বয়েই একটি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য হয়। আর সেই কারণেই কমিশনার সানাউল্লাহর বক্তব্যে গণমাধ্যমের ভূমিকা এতবার উঠে এসেছে। তার মতে, দেশের স্বার্থে ভালো নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই; একইভাবে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল উপস্থিতিও অপরিহার্য।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই হতে পারে নতুন পথচলার সূচনা। নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম এবং জনগণ সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে এ নির্বাচনী প্রক্রিয়া সত্যিই হতে পারে ইতিহাসের ভিন্ন মাত্রার।