ডেঙ্গুতে আরো ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে বেড়েছে ভর্তির চাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার
Dengue

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ডেঙ্গুতে আরো ৫ জনের মৃত্যু হওয়ায় দেশে এডিস মশাবাহী এই রোগের পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, একদিনে নতুন করে ৪৯০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯১ জনে, আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছুঁয়েছে ৯৬ হাজার ৬৭–এর ঘর।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়, তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর সংক্রমণ শুরু হয় আগেভাগেই এবং ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ে সব বিভাগে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশনে দুর্বলতা, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং শহুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে, আর সে কারণেই সংক্রমণের মাত্রা বারবার বেড়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই ওঠানামা করলেও মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কা বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৫ জনের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং দু’জন ময়মনসিংহ বিভাগে। এছাড়া ঢাকা উত্তরে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছরের হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে—মোট ১৭৯ জন। যা রাজধানীর জনঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাঝে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটিতে মৃত্যু হয়েছে ৬৬ জনের, বরিশাল বিভাগে ৪৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১ জন, ময়মনসিংহে ২৪, রাজশাহীতে ২০, খুলনায় ১৩, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলাগুলোতে ৯ এবং সিলেটে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটিতে—১০৬ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৮, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭৭, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য অংশে ৭৪, বরিশালে ৫৮, ময়মনসিংহে ৩৩, খুলনায় ২৮, রাজশাহীতে ১৮, রংপুরে ৫ এবং সিলেটে ৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলেই আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বাড়া–কমা থাকলেও বরিশাল বিভাগে এ বছর যে পরিমাণ রোগী শনাক্ত হয়েছে তা আশঙ্কাজনক। বরিশালে মোট শনাক্ত রোগী ২০ হাজার ৮১৭—যা দেশের কোনও বিভাগের সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে পানি জমে থাকা এবং জলাবদ্ধতা এডিস মশার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

চলতি বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৯৬ হাজার ৬৭। এই সংখ্যাটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছে তা হাসপাতালের বেড সংকট, চিকিৎসক ও নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং ওষুধ–সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় সামাল দিতে অতিরিক্ত ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। অনেকে আবার ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় যথাযথ পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে জরুরি, এবং বাড়িতে চিকিৎসা নিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বিস্তার শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবার সংকট নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দুর্বলতা প্রকাশ করে। এডিস মশা ঘরের ভেতরে এবং আশপাশে পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। তাই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সরকারের একযোগে কাজ করা ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন। আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা, বাসাবাড়ির ফুলের টবে পানি পরিবর্তনের অনিয়ম এবং জনসাধারণের উদাসীনতা মিলেই এডিসের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বার্ষিক পরিকল্পনার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে হবে, যাতে শুধু মশা নিধনে জরুরি উদ্যোগ নয়, বরং পরিবেশগত উন্নয়নও নিশ্চিত করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরের বেশি সময়ই উষ্ণ–আর্দ্র আবহাওয়া তৈরির ফলে এডিস মশা এখন শুধু বর্ষা নয়, প্রায় পুরো বছরই সক্রিয়। এর ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রচলিত কৌশলগুলো এখন আর যথেষ্ট নয়।

মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, তা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন যে অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসেন, যার ফলে জটিলতা বেড়ে যায়। ডেঙ্গুর একটি বড় সমস্যা হলো রোগী কখন গুরুতর অবস্থায় যাচ্ছে তা অনেক সময় বোঝা যায় না, কারণ উপসর্গ হঠাৎ করে খারাপ হতে পারে। তাই জ্বর দেখা দিলে যথাসময়ে পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে সিটি করপোরেশনগুলো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানালেও নগরবাসীর অভিযোগ ভিন্ন। অনেকেই বলছেন, বাস্তবে মশকনিধন কার্যক্রম আগের মতো সক্রিয় নয়, পর্যাপ্ত ফগিং বা লার্ভানাশক প্রয়োগ হচ্ছে না, এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা নিয়মিত পরিদর্শনে আসেন না। ফলে মানুষ নিজ নিজ উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হচ্ছে।

ডেঙ্গুতে আরো ৫ জনের মৃত্যু গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি মহামারি মোকাবিলার পর ডেঙ্গুর মতো রোগে লাগাতার চাপ সামাল দিতে স্বাস্থ্যখাতের প্রস্তুতি কতটা, সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, দেশজুড়ে ডেঙ্গুর অবস্থা শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি একটি চলমান সংকটের প্রতিচ্ছবি। এডিস মশার দমন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা—সকল পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ। স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পরিস্থিতির গুরুত্ব আবারও তুলে ধরছে, এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন যে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত