প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
কারখানায় ট্রলিচাপায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু শ্রীমঙ্গলের শান্ত ভূনবীর এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। বুধবার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের রোশনি পলি ফাইবার প্লাস্টিক কারখানার ভেতরে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু একটি শ্রমিকের মৃত্যু নয়, বরং দেশের শ্রমপরিবেশে নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘদিনের বাস্তবতাকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে। নিহত নারী শ্রমিকের নাম মার্জিয়া বেগম, বয়স ৪০ বছর। তিনি উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের রাজপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং পরিবারে ছিলেন দুই সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের ভরসা।
কারখানার গেট খোলার কিছুক্ষণ পরই প্রতিদিনের মতো কাজে যোগ দেন তাঁরা। সহকর্মীদের ভাষ্য, সকালটি ছিল অন্য দিনের মতোই। কেউ মেশিনের কাছে, কেউ প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ করে মালামাল পরিবহনের ট্রলিটি পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। বেশ কয়েকজন শ্রমিক চিৎকার করে সতর্ক করার আগেই ট্রলিটি ধাক্কা দিয়ে ফেলে মার্জিয়াকে। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই ট্রলির চাকার নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। ট্রলিচালকও এতে আহত হন এবং তাকে দ্রুত শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
কারখানার কর্মকর্তা মো. শাকিল জানান, দুর্ঘটনাটি ঘটে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে। তিনি বলেন, কারখানার নিত্যদিনের কাজের মধ্যেই হঠাৎ ট্রলিটি নিয়ন্ত্রণ হারায়, আর তাতেই ঘটে যায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। তাঁর ভাষায়, শ্রমিকের মৃত্যুতে কারখানার সব কর্মী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ঘটনার পরপরই এলাকার মানুষ কারখানায় ভিড় জমান এবং অনেকেই উত্তেজিত হয়ে ভাঙচুর চালান, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এদিকে নিহতের স্বামী আকরাম আলী ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, আমার স্ত্রী হত্যার বিচার চাই। আমার ছেলে-মেয়েরা এতিম হয়ে গেল, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কারখানায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটে, কিন্তু মালিকপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। তিনি দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু অবহেলার ফল এবং এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জসিম আহমেদ বলেন, এই ঘটনার পর কয়েক হাজার মানুষ এলাকায় উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তিনি জানান, এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে কারখানার নিরাপত্তাহীন অবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, কারখানায় ভারী যন্ত্রপাতি চলাচলের সময় কতটা সতর্কতার প্রয়োজন, তা ব্যবস্থাপনা কখনোই গুরুত্ব দেয় না। ফলে শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, দুর্ঘটনার সময় পাশেই কাজ করছিলেন আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক। তারা ছুটে গিয়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও কোনো সুযোগ ছিল না। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঘটনাতেই ঝরে যায় একটি জীবন। আহত ট্রলিচালকসহ অন্য কর্মীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, যদি ট্রলিটি অতিরিক্ত বোঝাই না হতো বা নিরাপত্তা কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতেন, তাহলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।
রোশনি পলি ফাইবার ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেডের এজিএম শাকিল বলেন, আজকের এই দুর্ঘটনা আমাদের জন্য অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা নিহতের পরিবারকে আশ্বস্ত করেছি যে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। কোম্পানির নীতি অনুযায়ী তারা যেন সব ধরনের আর্থিক সহায়তা পান, সে ব্যবস্থা করা হবে। তবে শ্রমিকদের অভিযোগ বা নিরাপত্তাজনিত ঘাটতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও তিনি বলেন, কোম্পানি সব সময় নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়।
কিন্তু এলাকাবাসী ও শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ স্পষ্ট। তাদের মতে, কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যত নেই বললেই চলে। কোনো জরুরি ওয়ার্নিং সিস্টেম নেই, নেই সঠিক তদারকি। শ্রমিকরা বলেন, ট্রলি চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ না করা এবং ট্রলির রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার বড় কারণ।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইসলাম উদ্দিন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একসঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেন। ইউএনও বলেন, ঘটনাস্থলে এসে কারখানার ব্যবস্থাপনার সাথে কথা বলা হয়েছে। তারা প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে নীতি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঘটনার পেছনের অবহেলা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় সমাজের অনেকেই মনে করছেন, প্রতিদিনকার জীবিকার তাগিদে শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হলেও নিরাপত্তাহীন একটি পরিবেশে তারা প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে থাকছেন। শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানায় নিরাপত্তা কর্মকর্তা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ফ্যাক্টরিতেই এগুলো মানা হয় না। শ্রমিকরা বলেন, মালামাল পরিবহনের ট্রলি নিয়মিত সার্ভিসিং করা হলে হয়তো এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
শ্রম অধিকার কর্মীরাও ঘটনার পর সরব হয়েছেন। তাদের মতে, দেশের শিল্পখাতের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন সমানতালে না হওয়ায় এই ধরনের দুর্ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। একটি শ্রমজীবী পরিবারে একজনের মৃত্যু মানে পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়া। আর তাই ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে কারখানায় ট্রলিচাপায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু শ্রীমঙ্গলের শ্রমিক সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে এবং দেশের শ্রম অধিকার ও শিল্প সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী উঠে আসে এবং নিহত শ্রমিকের পরিবার কতটা ন্যায়বিচার ও সহায়তা পায়। তবে এ ঘটনাটি যে দেশের শিল্প কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, তা বলাই বাহুল্য।