তিতাসে ট্রলি উল্টে নদীতে পড়ে একই পরিবারের তিন নারী নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৬ বার
তিতাসে ট্রলি উল্টে নদীতে পড়ে একই পরিবারের তিন নারী নিহত

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লার তিতাসে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে কড়িকান্দি-রাজাপুর সড়কের তিতাস নদীর ধার ঘেঁষা এলাকায় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। লোকজনের স্বাভাবিক দিনযাপনের মাঝেই ঘটে যাওয়া এই ঘটনা স্থানীয়দের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এনেছে, আর স্বজন হারানো পরিবারের মাঝে সৃষ্টি করেছে অসীম বেদনা।

নিহত তিন নারী হলেন—চর রাজাপুর এলাকার শুক্কুর আলীর স্ত্রী রিনা আক্তার, বয়স ৩৫; ইমন মিয়ার স্ত্রী রুজিনা আক্তার, বয়স ৩০; এবং ফারুক মিয়ার স্ত্রী সামছুন নাহার, বয়স ৪০। এদের মধ্যে রুজিনা ও সামছুন নাহার আপন জা এবং রিনা আক্তার তাদের ভাগিনার স্ত্রী। তিনজনই একই সময় নদীতে গোসল করতে গিয়ে প্রাণ হারান।

তিতাস থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদ সাইফুল্লা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে ততক্ষণে দুই নারী নদীতে ট্রলি চাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকি একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে সেখানেই চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, দুপুরের দিকে নদীর ঘাটে গোসল করছিলেন তিন নারী। সাধারণ দিনের মতোই নদীর পানি ছিল শান্ত, ঘাটেও ছিল না ভিড়। ঠিক সে সময় রাজাপুর এলাকা থেকে একটি খালি ট্রলি কড়িকান্দি বাজারের দিকে যাচ্ছিল। চালক কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারালেন তা এখনো পরিষ্কার নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রলিটি রাস্তার ধারের খানাখন্দ পেরিয়ে সোজা তিতাস নদীর দিকে গড়িয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি গিয়ে পড়ে গোসলরত নারীদের ওপর।

দুর্ঘটনার মাত্রা এতটাই ছিল যে রিনা ও রুজিনার মৃত্যু ঘটে মুহূর্তের মধ্যেই। সামছুন নাহার তখনও শ্বাস নিচ্ছিলেন, তবে আঘাত ছিল গুরুতর। এলাকাবাসী তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলেও তিনি বাঁচতে পারেননি।

স্থানীয়দের অনেকেই বলেন, ঘাটের ধার ঘেঁষে যাতায়াত করা ট্রলিগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিছুদিন আগেও একই রাস্তায় এক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। সড়কের পাশের মাটি সরে যাওয়ায় ট্রলি বা ভটভটি সামান্য বেখেয়ালে গেলেই নদীর দিকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয়দের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমে ছিল। তিন নারীর মৃত্যু সেই ক্ষোভকে আজ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

চর রাজাপুর একটি ছোট গ্রাম—এখানে সবাই সবাইকে চেনে। তাই একই পরিবারের তিন নারীর আকস্মিক মৃত্যু পুরো গ্রামে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছে। মৃতদের স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। স্বামীরা হারিয়েছেন স্ত্রী, সন্তানরা হারিয়েছে তাদের মাকে। প্রতিবেশীরা জানান, তিন নারীরই স্বামী দিনমজুর বা প্রবাস থেকে সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের ভার সামলাচ্ছিলেন নারীরাও, ঘর-সংসার সামলানোর পাশাপাশি অনেক সময় সামান্য আয়ের কাজও করতেন।

দুর্ঘটনার পর আশপাশের মানুষ ছুটে আসে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ট্রলিটি উদ্ধার করে এবং সুরতহাল শেষে নিহতদের মরদেহ আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ওসি খালেদ সাইফুল্লা জানান, প্রাথমিক তদন্ত চলছে এবং ট্রলির চালকের অবস্থানও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চালক দুর্ঘটনার পরপরই সরে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ শুরু করেছে।

দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নদীর কিনারায় একটি ছোট ঘাট, যেখানে প্রতিদিনই স্থানীয় নারীরা গোসল ও গৃহস্থালি কাজ সারেন। ঘাটের ঠিক উপরে কড়িকান্দি-রাজাপুর সড়ক, যে সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলি, ভটভটি, মোটরসাইকেল এবং ছোট যান চলাচল করে। স্থানীয়দের মতে, সড়কের পাড়ে কোনো নিরাপত্তা রেলিং না থাকায় যেকোনো সময় এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারা বহুবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে রাস্তায় সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়ানোর দাবি জানালেও তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

নারীদের মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা জড়ো হয়ে রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। অনেকেই বলেন, রাস্তার ধারের পাড় শক্ত করে ভরাট করা এবং সুরক্ষার রেলিং স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।

তিতাস উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কারণ তদন্তের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। একই সঙ্গে রাস্তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট পাঠানো হবে।

এই দুর্ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দেশের গ্রামাঞ্চলে এমন অসংখ্য সড়ক রয়েছে, যেখানে দৈনন্দিন ঝুঁকি নিয়ে মানুষ যাতায়াত করে। ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচল, রাস্তার পাশের সুরক্ষা ব্যারিয়ার না থাকা, চালকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনা যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদিকে যেমন তিন নারীর মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে নেমেছে শোকের ছায়া, অন্যদিকে সমাজে নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে চলে এসেছে। নিহতদের পরিবার এখন শোকের ভারে বিধ্বস্ত। তিতাসের মতো শান্ত গ্রামের ওপর এমন ট্র্যাজেডি নেমে আসবে—কেউ কল্পনাও করেনি।

গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, “আমাদের মেয়েরা নদীতে গোসল করতে গিয়েছিল, কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। কিন্তু রাস্তায় যানবাহনের অব্যবস্থাপনা তাদের জীবন কেড়ে নিল। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।”

সমাজে প্রতিদিনের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু শুধু পরিবার নয়, পুরো কমিউনিটিকে নাড়িয়ে দেয়। শিশুদের কান্না, স্বজনদের আহাজারি এবং প্রতিবেশীদের বেদনার মধ্য দিয়ে মৃত তিন নারীকে স্মরণ করা হচ্ছে। তাদের জীবন হারানোর এই ঘটনা তিতাসবাসীর মনে দীর্ঘদিন মনে থাকবে।

মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই পরিবারের তিন নারীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু তিতাসবাসীর মন ভারী করে তুলেছে। এখন অপেক্ষা—দুর্ঘটনার প্রকৃত তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত