প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতির শেষ ধাপে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। সবকিছু সুসংগঠিতভাবে শুরুর জন্য ডিসেম্বরের ১০ বা ১১ তারিখে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সমশের আলীর সঙ্গে কমিশনের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলে কমিশনের এক সদস্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসি সূত্র মতে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক দিনের মধ্যেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। এ সময়ের মধ্যে কমিশন নির্বাচন ও গণভোটের যাবতীয় প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং নির্বাচনকালীন দিকনির্দেশনার বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পরই দেশজুড়ে নির্বাচনী উত্তাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সাথে গণভোটের আয়োজন করা হবে। সেই লক্ষ্যেই ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী ৭ ডিসেম্বর তফসিল নিয়ে কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে তফসিলের তারিখ, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা, যাচাই-বাছাই, প্রতীক বরাদ্দ এবং প্রচারণা শুরুর দিনসহ অন্যান্য বিস্তারিত চূড়ান্ত করা হবে।
ইসির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ নির্বাচন কমিশনের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ইসি রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করে থাকে। এবারের নির্বাচন ও গণভোট, উভয়ই একইসঙ্গে আয়োজন হওয়ায় প্রস্তুতিও জটিল ও সময়সাপেক্ষ। কমিশন তাই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সবদিক পর্যালোচনা করে অগ্রসর হচ্ছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার বিষয়ে তারা আশাবাদী। তিনি জানান, গণভোটের প্রস্তুতি এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি, তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে শিগগিরই দেশব্যাপী গণভোট বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাবে। তার ভাষায়, জনগণের মধ্যে গণভোটের বিষয়টি স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ভোটিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচনকে ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন সিইসি। তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনী সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছে এবং নির্বাচনকালীন সময়ে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ছিনতাই-ছুরিকাঘাত বা বিচ্ছিন্ন অপরাধকে কেন্দ্র করে নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনী পরিবেশ কেমন হতে পারে—এমন প্রশ্নের উত্তরে সিইসি বলেন, নির্বাচনকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করতে ইসি বিভিন্ন স্তরে কাজ করছে। দেশের মানুষ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ের ভোটের সেই চিরচেনা পরিবেশ দেখার সুযোগ পায়নি। তাই ভোটারদের কাছে ভোটদান প্রক্রিয়া পরিচিত করে তোলাই এখন ইসির অন্যতম লক্ষ্য। সে কারণেই দেশজুড়ে মক ভোটিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণ যাতে ভোট দিতে এসে বিভ্রান্ত না হয় এবং দুটি ব্যালটে কত সময় লাগতে পারে, সেটি পর্যবেক্ষণ করতেও মক ভোটিং রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ে ভোটকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতিও মূল্যায়ন করতে পারছে। কোথায় ভোটের গতি ধীর, কোন এলাকায় প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন, কোন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ জোরদার করা দরকার—সব তথ্য কমিশন সংগ্রহ করছে।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ, আসন সমঝোতা, প্রচারণা কৌশল—সবকিছু নিয়েই এখন রাজনীতির কেন্দ্রে ব্যস্ততা। নির্বাচনী পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ রাখতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইসির সাক্ষাৎকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আইনি কাঠামোকে আরো দৃঢ় করে এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি অনিবার্য অংশ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন এবং তাকে নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সঙ্গে আয়োজিত হওয়ায় প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ভোটকেন্দ্র, ব্যালটপেপার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যবেক্ষক দল, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ—এসবই এখন প্রস্তুতির কেন্দ্রে।
ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ইসির বিভিন্ন কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। নতুন ভোটারদের তালিকা হালনাগাদ, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সহায়তা, নারী ভোটারদের নিরাপদ উপস্থিতি নিশ্চিত করা, গ্রাম ও শহরে ভোটার সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা—সবই চলছে সমান্তরালভাবে।
একই সঙ্গে গণভোটের প্রস্তুতিও একটি বিশাল প্রক্রিয়া। গণভোটের ব্যালটে থাকবে ভিন্ন প্রশ্ন, যা নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি জনগণকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কমিশন মনে করে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া গণভোটের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তাই গণভোটের সারমর্ম ও তার গুরুত্ব জনগণের কাছে তুলে ধরতে সচেতনতা প্রচারণা শিগগিরই বাড়ানো হবে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইসির সাক্ষাৎ শেষে তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে নির্বাচনী উত্তাপ। এরপর রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণায় নামবে, প্রার্থীরা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করবে এবং সারাদেশে নির্বাচনী পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হবে। আগামী নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও ইতোমধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। ভোটাররা প্রত্যাশা করেন একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ নির্বাচন, যেখানে তারা নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবেন। কমিশনও একই প্রত্যাশা নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, এমনটাই জানিয়েছেন সিইসি নাসির উদ্দিন।
সবশেষে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মতে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ নির্বাচন প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ গতিতে এগোবে এবং দেশ进入 করবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এক নতুন অধ্যায়ে।