ঢাকা ও দিল্লি বায়ুদূষণে শীর্ষে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬০ বার
ঢাকা দিল্লি বায়ুদূষণ স্কোর

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মেগাসিটি ঢাকার বায়ুদূষণ। শরৎকালে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও হেমন্তের শুরুতেই দূষণের মাত্রা আবার ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্যানুযায়ী, ঢাকার বায়ুমানের একিউআই স্কোর ২৫২ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ হিসেবে ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।

একই সময়ে ভারতের রাজধানী দিল্লি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে শীর্ষে রয়েছে, ২৭৫ একিউআই স্কোর নিয়ে। মিশরের কায়রো ২৪২ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে, পাকিস্তানের লাহোর ১৯২ ও করাচি ১৮৬ স্কোর নিয়ে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে। এই তথ্য পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা প্রকাশ করেছেন।

একিউআই স্কোরের মান নির্ধারণ করা হয়েছে শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্তকে ভালো, ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্তকে মাঝারি, এবং ১০১ থেকে ১৫০ পর্যন্ত সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে। ১৫১ থেকে ২০০ স্কোর ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১ থেকে ৪০০ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ধরা হয়। ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে অবস্থান করতে এবং বাইরে প্রয়োজন ছাড়া না বের হতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

ঢাকার বায়ুদূষণের এই চরম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বর্ষাকালের পর শহরে বৃষ্টিপাতের অভাব, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত বায়ুদূষক এবং কাঠ ও খড় জ্বালানির প্রচলন মূল ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে শীতকালে স্থবির বাতাসের কারণে দূষিত কণাগুলো শহরের উপরের স্তরে আটকে থাকে এবং মানুষের শ্বাসকেন্দ্রীয় রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ডাক্তাররা জানিয়েছেন, দূষিত বায়ু কেবল শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসনালী সংক্রান্ত সমস্যাই সৃষ্টি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের জটিল রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। শিশুরা শারীরিকভাবে আরও সংবেদনশীল এবং তাদের শ্বাসনালী ছোট হওয়ায় দূষণের প্রভাব বেশি তীব্র হয়। প্রবীণরা বা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসনালী ও হৃৎপিণ্ডের সমস্যা নিয়ে যারা ভুগছেন, তাদের জন্য এই বায়ু জীবনহুমকিস্বরূপ হতে পারে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ঢাকা শহরের দূষণের মাত্রা কমাতে প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন। শহরের যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানার নির্গমন সীমিত করা, এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়োপযোগী। বিশেষ করে ধুলিকণা, গাড়ি ও শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া কমাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন।

আইকিউএয়ারের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ঢাকা এবং দিল্লি ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বড় শহর যেমন লাহোর ও করাচি দূষণের ভয়াবহতার শিকার। এই অঞ্চলের বায়ুদূষণ শুধুমাত্র দেশীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশগত সংকটও তৈরি করছে। গবেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই দূষণের সম্পর্ক রয়েছে।

ঢাকার জন্য শীতকালের বায়ুদূষণ বিশেষভাবে সমস্যাজনক। শীতকালে কম বাতাসের গতিবেগ এবং স্থবির আবহাওয়ার কারণে দূষণ উপরের স্তরে আটকে থাকে। এই সময় শহরের মানুষ সকাল ও সন্ধ্যার সময় বাইরে কম বের হওয়ার পরামর্শ পান। বিশেষ করে যাদের হাঁপানি, সাইনাস, ব্রঙ্কাইটিস বা অন্যান্য শ্বাসনালী রোগ আছে, তাদের জন্য এটি অতীব ঝুঁকিপূর্ণ।

সার্বিকভাবে, ঢাকার বায়ুদূষণ একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, অর্থনীতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা বাইরে খেলাধুলা করতে পারছে না, অফিস ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম সীমিত হচ্ছে, এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার মান কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, দূষণ রোধে নাগরিকরাও অংশ নিতে পারে। যানবাহন কম ব্যবহার, সাইকেল বা পায়ে হেঁটে চলাচল, প্লাস্টিক ও ধোঁয়াশালী জ্বালানির ব্যবহার কমানো, গাছ লাগানো—এসব পদক্ষেপ দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য। প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

ঢাকা শহরের মতো বিশ্বমেট্রোপলিসগুলোর জন্য বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও স্বাস্থ্যজনিত সঙ্কট। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরণের দূষণ জীবনকাল ছোটাতে পারে এবং বড় রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই শহর পরিকল্পনা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা, শিল্প নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়োপযোগী।

আজকের পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২৫২ একিউআই স্কোরের সঙ্গে ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, যা নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থদের জন্য বাড়ির ভেতরে থাকার এবং বাইরে সীমিত কার্যক্রম করার পরামর্শ জারি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দূষণের মাত্রা যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে এটি ক্রমবর্ধমান শ্বাসনালী রোগ, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা এবং অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

ঢাকার মতো দ্রুত বর্ধমান মেগাসিটিগুলোর জন্য বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজন। শুধুমাত্র প্রশাসন নয়, নাগরিক এবং শিল্প উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে এই শহরের বাতাসকে সুস্থ ও নিরাপদ করা সম্ভব।

বর্তমানে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে তা না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমবর্ধমান হবে এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়বে।

ঢাকা এবং দিল্লির মতো শহরগুলোর বায়ুদূষণ শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই প্রয়োজন সরকারের সক্রিয় হস্তক্ষেপ, শিল্প ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত