ভাঙ্গায় অটোরিকশায় বাসের ধাক্কা, একই পরিবারের ৩ জনসহ নিহত ৪

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫০ বার
ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় মা-শিশুসহ নিহত ৪

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা অংশে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা আবারও নাড়িয়ে দিলো পুরো অঞ্চলকে। শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলার কৈডুবি সদরদী রেল ক্রসিং এলাকায় ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। এতে একই পরিবারের তিনজন—মা, শিশু সন্তান ও নানিসহ মোট চারজন নিহত হন। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরও এক অজ্ঞাতনামা বৃদ্ধ যাত্রী। এই মৃত্যুর ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভাঙ্গা ও আশপাশের এলাকাজুড়ে। যারা মারা গেছেন, তারা সবাই একটি অটোরিকশায় অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে যাত্রাপথে ছিলেন। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন, হাসি—সব কিছুই মুছে যায়।

নিহতদের মধ্যে তিন বছরের শিশু রায়ান একটি নিরপরাধ জীবন, যার ছোট পৃথিবী ছিল পরিবারকে কেন্দ্র করে। তার মা রিমু বেগম ছিলেন সন্তানের মেডিকেল চিকিৎসার জন্যই ভাঙ্গায় এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন রিমুর মা, রায়ানের নানি নুরুন্নাহ বেগম। এই তিনজনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, একটি পুরো গ্রামের মানুষের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। শিশু রায়ানের বাবা কবিরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি মুনসুরাবাদ। পরিবারের সবার চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—এক মুহূর্তের অসতর্কতা বা দ্রুতগতির এই নির্মম ধাক্কা কেন তাদের জীবন কেড়ে নিলো?

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, তারা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। দুর্ঘটনায় আহত চারজনকে উদ্ধার করে দ্রুত ভাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ফরিদপুর জেলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মদিনা পরিবহনের যে বাসটি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, সেটি জব্দ করা হয়েছে এবং চালককে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

স্থানীয়রা জানায়, সকালে শিশুটির শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে তার মা ও নানি চিকিৎসার জন্য ভাঙ্গা শহরে যান। চিকিৎসা শেষে তারা ভাঙ্গা দক্ষিণপাড় বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। অটোরিকশাটিতে আরও কয়েকজন যাত্রী ছিলেন। রেল ক্রসিং এলাকায় পৌঁছানোর পর বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগামী একটি মদিনা পরিবহনের বাস অতিরিক্ত গতিতে এসে অটোরিকশাটিতে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কাটি এতটাই তীব্র ছিল যে অটোরিকশাটি উল্টে গিয়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রায়ান, তার মা রিমু বেগম ও নানি নুরুন্নাহ বেগম। সঙ্গে মারা যান অজ্ঞাত পরিচয়ের একজন বৃদ্ধ যাত্রী।

এই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা বলছেন, বাসের গতি ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। তারা জানান, বাসটি দেখা মাত্রই চালক হর্ন দিতে শুরু করেন কিন্তু অটোরিকশাকে এড়িয়ে যাওয়ার মতো গতি কমাননি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে যায় ভয়াবহ সংঘর্ষ। স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। এসময় জড়ো হওয়া লোকজনের কান্না, চিৎকারে এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।

পুলিশ জানিয়েছে, অজ্ঞাত পরিচয়ের নিহত বৃদ্ধের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। তার কোনো পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি। স্থানীয় থানা পুলিশ আশপাশের থানাগুলোতেও বার্তা পাঠিয়েছে পরিবার খুঁজে বের করার জন্য।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুনসুরাবাদ গ্রামে শুরু হয় শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। তিনজনের মরদেহ পাশাপাশি দেখে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। রায়ানের বাবা কবিরুল ইসলাম শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা জানান, রিমু বেগম সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বলেছিলেন, চিকিৎসা করিয়ে দুপুরের আগেই ফিরবেন। কিন্তু তারা ফেরেন লাশ হয়ে।

স্থানীয়দের বক্তব্য, ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের এই অংশে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া বাস চালনা এবং যথাযথ সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই প্রাণহানি ঘটে। কৈডুবি রেল ক্রসিং এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। কোনো গেটম্যান নেই, সতর্কতা ব্যবস্থা দুর্বল—এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর আইন প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন। বাস মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মনিটরিং, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে এমন দুর্ঘটনা থামানো সম্ভব নয়। প্রতি বছর বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, যার বড় অংশই ঘটে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনার কারণে। আজকের এই দুর্ঘটনাও তারই নির্মম উদাহরণ।

ভাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং প্রয়োজনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসায় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তারা।

এদিকে, দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানান। তাদের দাবি, দ্রুতগতির বাস নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় চারটি প্রাণ ঝড়ে গেলেও রেখে গেল অসংখ্য বেদনা, আরেকটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস, আর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন। স্বজন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়া পরিবারগুলোর কান্না আজ ভাঙ্গা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দূর–দূরান্তে। তাদের দাবি একটাই—আর যেন এমন মৃত্যু না ঘটে, আর যেন কোনো বাবা–মা, সন্তান বা পরিবার সড়কে এভাবে প্রাণ না হারায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত