প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার লিটুখান বাজারের দুজন নিম্নআয়ের দোকানদার হতবাক হয়ে পড়েছেন, যেন হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়েছে তাদের জীবনে। প্রতিদিনের সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে যাদের সংসার চলে, সেই মানুষদের হাতে যখন মাসিক দুই–তিন শ টাকার বদলে কয়েক হাজার নয়, এক লাফে কয়েক দশক আগের অবিশ্বাস্য অঙ্কের বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র বাজারজুড়ে সৃষ্টি হয় উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং আতঙ্ক। যারা দোকানের ছোট ফ্যান, বাতি বা একটি ছোট ফ্রিজ দিয়েই সামান্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের জন্য ২৪ হাজার কিংবা ৫৫ হাজার টাকার বিল শুধু অস্বাভাবিক নয়, অসম্ভবও বটে। অথচ বাস্তবেই এমন ঘটনা ঘটেছে লিটুখান বাজারে।
চায়ের দোকানি বাদশা ব্যাপারী সাধারণত মাস শেষে শান্ত ভাবে দুই–তিন শ টাকা বিল পরিশোধ করেন। তার দোকান বলতে একটি ছোট ঘর, যেখানে গ্রীষ্মে একটু বাতাসের জন্য একটি ছেলেমানুষী ফ্যান আর আলো জ্বালাতে একটি মাত্র বাল্ব। এই দুটিই তার সমস্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার। কিন্তু নভেম্বর মাসের বিল হাতে নেওয়ার পর চোখ কপালে ওঠে তাঁর। কাগজে ছাপা অঙ্কটি ঠিক যেন অবিশ্বাস্য কোনো ভুল—৫৫ হাজার ৫৫০ টাকা। হতবাক বাদশা কাঁপা গলায় বললেন, “এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। একফ্যান–এক বাল্বে এমন বিল কীভাবে আসে? অফিসে ফোন করলাম, তারা শুধু বলে গিয়ে দেখতে। কিন্তু যাওয়ার আগেই তো আমাদের মাথা ঘুরে যায় এই বিল দেখে।”
একই বাজারের খাবারের দোকান চালান শহীদ খান, যিনি প্রতিদিনের গরম ভাত–সবজি আর স্ন্যাকসে বাজারের মানুষকে সেবা দেন। তার দোকানে ব্যবহৃত দুটি লাইট, একটি ফ্যান এবং একটি ছোট ফ্রিজ—সব মিলিয়ে বিদ্যুতের মাসিক বিল কখনো এক হাজার টাকাও ছাড়ায় না। কিন্তু এবার তার হাতে ধরানো বিল ২৪ হাজার ২১৬ টাকা। বিল হাতে নেওয়ার মুহূর্তটিকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বিলটা দেখে মনে হলো কারো কোনো দুষ্টুমি। মাথা ঘুরে গেছে। দোকান চালানোই কঠিন হয়ে যাবে এভাবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এটি হঠাৎ নতুন কিছু নয়; বরং গত কয়েক মাস ধরে বাজারের কয়েকজন একই ধরনের ‘ভুতুড়ে বিল’ পেয়েছেন। কখনো ১০ গুণ, কখনো ৫০ গুণ এমনকি ১০০ গুণ পর্যন্ত বেশি দেখিয়ে বিল আসে, যা তারা কোনোভাবেই মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পান না। বাজারের বণিকরা জানাচ্ছেন, সমস্যাটি নিয়মিত হওয়ার পরও সঠিক সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ—মিটার রিডিং নেওয়ায় বড় ধরনের অবহেলা রয়েছে, একই সঙ্গে বিল প্রস্তুতিকরণ সফটওয়্যার বা তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুতর গরমিল থাকতে পারে।
ঘটনার খবর বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ প্রশ্ন তুলছে—সারাদেশে যখনই ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের কথা বলা হয়, তখনই কেন পল্লী বিদ্যুৎ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উত্তর থাকে ‘ত্রুটি’ বা ‘প্রযুক্তিগত সমস্যা’? অথচ এসব সমস্যার কারণে যে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে, তাদের ক্ষতির দায় কে নেবে? সদ্য পাওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিটুখান বাজারের ব্যবসায়ীরা এক হয়েছেন এবং যৌথভাবে অভিযোগ জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দোকানিদের অভিযোগের পর বিল প্রস্তুতকারী কর্মী সুমি রানী দাস বলেন, গ্রাহকদের ইতিমধ্যেই অফিসে এসে বিষয়টি যাচাই করতে বলা হয়েছে। তার ভাষায়, “যদি কেউ সমস্যায় পড়ে থাকে, তারা অফিসে আসলে আমরা আবার রিডিং দেখে বিল ঠিক করে দেব। মাঝেমধ্যে ত্রুটি হয়, কিন্তু তা সংশোধন করাই আমাদের কাজ।” তার বক্তব্যে মনে হলেও সমস্যা সমাধান সহজ, বাস্তবে দোকানিরা জানাচ্ছেন, প্রতিবারই ‘অফিসে আসুন’ বললেও সমাধান পেতে তাদের একধরনের আমলাতান্ত্রিক ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
টংগিবারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসার (ডিজিএম) মো. আব্দুস ছালাম বিষয়টি আরও খোলামেলা ব্যাখ্যা করে বলেন, “এটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি হতে পারে। অভিযোগ পেলে আমরা সরেজমিনে যাচাই করে দেখব এবং দ্রুত সমাধান করব।” তবে তার এই বক্তব্যে দোকানিদের মধ্যে আস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তারা বলছেন, তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য অবশ্যই বেরিয়ে আসবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত দিনে কেন এমন ত্রুটি চলতে থাকছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া তীব্র। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে সরকার প্রতিনিয়ত কথা বললেও কেন প্রান্তিক অঞ্চলে আজও বিদ্যুতের মিটার রিডিংয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত হয়নি? ভুতুড়ে বিলের শিকার হওয়া মানে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, তাই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের মানসিক বিপর্যয়, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং প্রতিনিয়ত এক ধরনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই।
বিদ্যুৎ খাতে অতীতে নানা জায়গায় একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। কখনো সফটওয়্যার ত্রুটি, কখনো ভুল রিডিং, কখনো অপারেটরের অবহেলা—অনেক কারণেই অস্বাভাবিক বিলের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা জানাচ্ছেন, প্রতিবারই সমস্যা ‘ত্রুটি’ হিসেবে গণ্য হলেও ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে তার মতো স্থায়ী কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে জনগণের মধ্যে আস্থা কমে যাচ্ছে।
লিটুখান বাজারের ব্যবসায়ীরা চাইছেন, এবার এমন একটি তদন্ত হোক যা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করবে। তারা দৃঢ়ভাবে দাবি করছেন, মিটার রিডিংয়ে ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করতে হবে, সফটওয়্যার সমস্যা থাকলে তা আপগ্রেড করতে হবে এবং ভুল বিলের কারণে যে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের যেন ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ বিবেচনা দেওয়া হয়। কারণ, দিন আনা–দিন খাওয়া মানুষ যখন একফ্যান–এক বাল্বের দোকানের জন্য ৫৫ হাজার টাকার বিল পায়, তখন সেটি কেবল একটি ভুল নয়; এটি মানুষের দুর্ভোগ তৈরি করার মতো বড় একটি ব্যর্থতা।
শেষ পর্যন্ত সত্যিই এটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নাকি মিটার রিডিংয়ের ভুল—তা তদন্তেই প্রমাণিত হবে। তবে এত বড় অঙ্কের বিল দুই জন পরিশ্রমী দোকানিকে যেভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে, তা এই মুহূর্তে লিটুখান বাজারের বড় আলোচনার বিষয়। জনমানুষ আশা করছে, দ্রুত তদন্ত হবে, ভুল বিল সংশোধন করা হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো গ্রাহক যেন এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হন।