ফরিদপুরে ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক, চোখ বাঁধা ভ্যানচালক উদ্ধার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ফরিদপুরে ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডে ভোররাতে দুর্বৃত্তদের বর্বরোচিত হামলায় এক মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যু এবং চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁর সঙ্গী ভ্যানচালককে উদ্ধার করার ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের গৌরদিয়া এলাকার কালীতলা সেতুর কাছে রহস্যজনক এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা উৎপল সরকার নামের ওই মাছ ব্যবসায়ীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা হতবাক হয়ে পড়ে। একই সময় সেতুর রেলিংয়ে বাঁধা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ভ্যানচালক ফিরোজ মোল্লাকে।

নিহত উৎপল সরকার ফরিদপুর সদরের কানাইপুর ইউনিয়নের রনকাইল গ্রামের অজয় সরকারের ছেলে। তিনি পেশায় মাছ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং প্রতিদিনের মতো সকালে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে মাছ কিনতে যাওয়ার পথে এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। প্রতিদিনই তিনি ব্যাটারি চালিত ভ্যানে করে বিভিন্ন বাজারে মাছ সংগ্রহ ও বিক্রি করতেন। পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপল ছিলেন পরিশ্রমী, নিরহঙ্কার ও অতি সাধারণ এক মানুষ। তাঁর হঠাৎ মৃত্যু পরিবারটিকে অসহায় করে তুলেছে।

স্থানীয়রা জানান, সকালে কে বা কারা চিৎকার করে ডাকতে শুরু করলে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে উৎপলের। পাশেই সেতুর রেলিংয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় কাঁপছিল ভ্যানচালক ফিরোজ। মুখে গামছা বাঁধা ছিল, চোখেও কাপড়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে পানি খাওয়ান এবং কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তিনি রাতের ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেন।

ফিরোজের বর্ণনায় উঠে আসে, মাঝরাতে গোপালগঞ্জের দিকে যাত্রা শুরু করার পর এক পর্যায়ে তিন থেকে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় লোক তাদের ভ্যানের গতি রোধ করে। তারা দেশীয় অস্ত্র হাতে জোর করে ফিরোজকে নামিয়ে চোখ বেঁধে সেতুর রেলিংয়ে বেঁধে ফেলে। দ্রুত উৎপলের কাছে থাকা টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর উৎপলের সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু হয় এবং দুর্বৃত্তরা তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। তারপর তারা অন্ধকারের মধ্যেই পালিয়ে যায়।

গ্রামের বাসিন্দা কাজী শাহীন বলেন, ‘‘আমরা যখন উৎপলের লাশ দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম ঘটনা খুব ভয়ংকর। ফিরোজ কিছুটা সুস্থ হয়ে যখন বলল ডাকাতরা তাদের আক্রমণ করেছে, তখন সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। কিন্তু উৎপলের সঙ্গে কেন এতটা নির্মমতা করা হলো, তা আমরা বুঝতে পারছি না।’’

এলাকাজুড়ে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষ মনে করছেন, এটি শুধু ডাকাতি নয়, বরং আরও গভীর কোনো কারণ থাকতে পারে। উৎপল সরকারের পরিবার ভেঙে পড়েছে আর শোকে মুহ্যমান তাঁর মা-বাবা ও স্ত্রী। পরিবারের সদস্যরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, উৎপলের কোনো শত্রু ছিল না, তিনি নিয়ম করে ব্যবসা করতেন এবং কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল না। তাই এমন হত্যাকাণ্ডের কারণ তারা কল্পনাও করতে পারছেন না।

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম মারুফ হাসান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রহস্যজনক। তিনি নিশ্চিত করেন যে দু–তিনজন দুর্বৃত্ত এ হামলায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি ডাকাতি বলা যাচ্ছে না। কারণ, ঘটনাস্থলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত রয়েছে, যা অন্য কোনো উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেয়। পুলিশ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা ঘটনাটিকে খুব গুরুত্বসহকারে দেখছি। তদন্ত চলছে, খুব শিগগিরই প্রকৃত কারণ উদঘাটন সম্ভব হবে।’’

ঘটনাস্থলে থাকা রক্তের চিহ্ন, ব্যবহৃত অস্ত্রের সম্ভাব্য ধারণা এবং ভ্যানচালকের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে অনুমান করছেন, এটি পরিকল্পিত হামলাও হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নন।

এদিকে গৌরদিয়া এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয়দের আতঙ্ক দূর করতে ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ টহল জোরদার করেছে। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন এটি ডাকাতি, কেউ বলছেন উৎপলকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ সন্দেহ করছেন ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটতে পারে। তবে পুলিশ বলছে, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উৎপলের মৃত্যুতে কানাইপুর ইউনিয়নের রনকাইল গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গ্রামটির লোকজন বলেন, উৎপল সমাজে অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনা পুরো এলাকার মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। উৎপলের বৃদ্ধ বাবা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন, স্ত্রী কথাই বলতে পারছেন না। তাদের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন উৎপল সরকার।

ময়নাতদন্তের জন্য উৎপলের মরদেহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভ্যানচালক ফিরোজ মোল্লাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে, তবে তাঁকে পুলিশ তদন্তের স্বার্থে নজরদারিতে রেখেছে।

এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের জীবনে অন্ধকার নামায়নি, বরং পুরো এলাকাকে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কে ফেলে দিয়েছে। মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না, প্রতিদিনের মতো কাজে বের হয়ে আর কখনো বাড়ি ফেরা হয়নি উৎপলের। গ্রামবাসী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

পুলিশ বলছে, প্রত্যক্ষদর্শী ও আলামত বিশ্লেষণে তদন্ত এগোচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তারা ঘটনার পেছনের সত্যটি উদঘাটন করতে সক্ষম হবে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত