বছরজুড়ে ক্যাসপারস্কি ক্ষতিকর ফাইল শনাক্ত পাঁচ লাখ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ক্যাসপারস্কি ক্ষতিকর ফাইল শনাক্ত বৃদ্ধির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, তা ২০২৫ সালের বৈশ্বিক সাইবার জগতের ভয়াবহ বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে তুলে ধরেছে। গত এক বছরে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ লাখ ক্ষতিকর ফাইল শনাক্ত হওয়া অভূতপূর্ব হুমকির ইঙ্গিত দেয়, যা শুধু সাধারণ ব্যবহারকারী নয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং অনলাইনভিত্তিক সব কার্যক্রমের নিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ক্যাসপারস্কি সিকিউরিটি বুলেটিন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মহলে এই প্রতিবেদন নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ক্ষতিকর সফটওয়্যার শনাক্তকরণ বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। সংখ্যা বৃদ্ধির এই গতি শুধু উদ্বেগেরই নয়, বরং গোটা সাইবার দুনিয়ার জটিলতা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ অফিস বৃহস্পতিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানায়, যা দেশের প্রযুক্তি খাত ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাসওয়ার্ড চুরির উদ্দেশ্যে তৈরি ম্যালওয়্যার বা ‘পাসওয়ার্ড স্টিলার’ ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে, ব্যবহারকারী বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপনে নজরদারি ও চুরি করতে ব্যবহৃত স্পাইওয়্যারও বেড়েছে ৫১ শতাংশ। অন্যান্য ক্ষতিকর আক্রমণও বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ শতাংশ হারে। এই তথ্যগুলোই বলে দেয় ২০২৫ সাল সাইবার জগতের জন্য কতটা কঠিন সময় ছিল।

ক্যাসপারস্কির থ্রেট রিসার্চ বিভাগের প্রধান আলেকসান্দার লিসকিন এই পরিস্থিতিকে গুরুতরভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মতে, সাইবার দুনিয়ার জটিলতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি। করপোরেট নেটওয়ার্কে প্রবেশের সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে সফটওয়্যারের দুর্বলতা এবং ব্যবহারকারীর চুরি হওয়া পাসওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে হামলাগুলো দ্রুত বাড়ছে। ব্যবহারকারীরা একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড দিয়ে বা একই পাসওয়ার্ড একাধিক জায়গায় ব্যবহার করে শুধু নিজেদেরই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকেও হুমকিতে ফেলে দিচ্ছেন বলে তিনি সতর্ক করেন।

২০২৫ সালে উইন্ডোজ ব্যবহারকারীরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে ছিলেন। মোট সাইবার আক্রমণের ৪৮ শতাংশই লক্ষ্য ছিল উইন্ডোজ-চালিত কম্পিউটার ও ডিভাইস। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় ডিভাইস ব্যবহারের পরও উইন্ডোজ প্ল্যাটফর্মকে লক্ষ্য করে হামলার পরিমাণ এত বেশি হওয়া প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। এর বড় কারণ হচ্ছে, এই অপারেটিং সিস্টেমটিই বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, বিশেষ করে অফিস ও ব্যক্তিগত কাজে।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, বিশ্বের ২৭ শতাংশ ব্যবহারকারী অনলাইন-ভিত্তিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ইউএসবি, ইনস্টলার বা ডিস্কের মাধ্যমে ম্যালওয়্যারে আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, শুধু ইন্টারনেটের সংযোগই নয়, বহনযোগ্য ডিভাইসের মাধ্যমেও ক্ষতিকর ফাইল ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতগতিতে। এতে সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন করে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরে-বাইরে, ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় সংযুক্ত ডিভাইসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এই ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো ব্যবহারকারী না জেনে তার ডিভাইসে থাকা ফাইল বা সফটওয়্যার দিয়ে প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে ঢুকে গেলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ভঙ্গ ঘটতে পারে। এই দুর্বলতা থেকেই সুযোগ নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা।

বিশ্বব্যাপী অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এপিএসি (এশিয়া-প্যাসিফিক) ও ইউরোপে সাইবার হুমকি সবচেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে। বিশেষত পাসওয়ার্ড চুরি এবং স্পাইওয়্যার আক্রমণ বেড়েছে ধারাবাহিক গতিতে। এই দুই অঞ্চলে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত শহর, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বিপুলসংখ্যক অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে হামলাকারীদের লক্ষ্যও বেশি।

লিসকিন বলেন, ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের ওপর হামলা বাড়ছে, যা সাপ্লাই চেইন আক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো সফটওয়্যারের মূল উৎসে আক্রমণ করা গেলে সেই সফটওয়্যার ব্যবহৃত হাজারো প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর একই সঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ‘সাইবার ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি’ বা নিরাপত্তা কৌশল ছাড়া আর উপায় নেই। তা না হলে যেকোনো সময় তাদের কার্যক্রম দীর্ঘ মেয়াদে স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি কম নয়। একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড বা অসতর্ক ক্লিক ব্যবহারকারীকে বিপদে ফেলার পাশাপাশি তার কর্মস্থলের নিরাপত্তাতেও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। ক্যাসপারস্কি ব্যবহারকারীদের অনুরোধ করেছে অপরিচিত উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড না করতে, অজানা লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে এবং সর্বদা দুই-স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে। প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট রাখা অত্যন্ত জরুরি।

২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের সময়কাল প্রযুক্তিখাতের জন্য একটি পরিবর্তনের বছর হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক, জটিল ফিশিং আক্রমণ, র‍্যানসমওয়্যার—সব মিলিয়ে সাইবার জগতের ভারসাম্য নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী বছরগুলোতে সাইবার হুমকি আরও জটিল হবে, এবং এর মোকাবিলায় ব্যবহারকারী ও প্রতিষ্ঠান উভয়কেই সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ক্যাসপারস্কির এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তাকে আবারও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। ডিজিটাল অবকাঠামো যত বাড়ছে, ততই নিরাপত্তার ঝুঁকি বিস্তৃত হচ্ছে। তাই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সচেতন ব্যবহার, নিয়মিত মনিটরিং এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় ছাড়া এই লড়াইয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে।

প্রযুক্তিবিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে এমন প্রতিবেদন শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং সাইবার নিরাপত্তা যে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দেয়াল—সেটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত