প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভূমিকম্প—শব্দটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে জন্ম নেয় ভয়, অনিশ্চয়তা আর অদৃশ্য কোনো শক্তির আশঙ্কা। মুহূর্তের মধ্যে স্থির পৃথিবী যখন দুলে ওঠে, তখন সভ্যতার সব দৃশ্যমান ভরসা যেন এক ঝাঁকুনিতে নড়বড়ে হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প এমনই এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস এখনো শতভাগ নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশকে মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়। এই বাস্তবতায় ভূমিকম্পে কীভাবে বাঁচতে হবে, কীভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়—সেই প্রস্তুতিই হতে পারে মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে একটি বড়মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পুরোনো ও দুর্বল ভবন, সংকীর্ণ সড়ক এবং জরুরি সেবাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, ভূমিকম্পের আগের প্রস্তুতিই পারে জীবন বাঁচাতে। এই প্রস্তুতি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব।
ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরবাড়ি, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে ভারী আসবাবপত্রের অবস্থান একটি বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। আলমারি, শোকেস, বুকশেলফ, ফ্রিজ বা টেলিভিশনের মতো ভারী জিনিসগুলো দেয়ালের সঙ্গে ব্র্যাকেট বা শক্ত পেরেক দিয়ে বেঁধে রাখা থাকলে কম্পনের সময় সেগুলো পড়ে গিয়ে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। রান্নাঘরের খোলা তাকগুলোতেও কাচের বোতল বা ভঙ্গুর জিনিস নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নিচে রাখা শ্রেয়। ঘরের ভেতর জরুরি বের হওয়ার পথ সব সময় খালি রাখা এবং কোনোভাবেই তা আটকে না রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে জরুরি সময়ে কী করতে হবে, সেই বিষয়ে আগেভাগে ধারণা দেওয়া একটি মানবিক দায়িত্বের অংশ। শিশু, বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে অক্ষম সদস্যদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, যাতে দুর্যোগের মুহূর্তে তারা অবহেলিত না হন। ঘরে একটি জরুরি ব্যাগ বা “গো-ব্যাগ” প্রস্তুত রাখা যেতে পারে, যেখানে টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী, বিশুদ্ধ পানির বোতল এবং কিছু শুকনো খাবার থাকবে। অনেক সময় ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন এই ছোট প্রস্তুতিগুলো জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দুর্যোগ সংস্থা বলছে, ভূমিকম্প শুরু হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখা। ভয় পেয়ে ছুটাছুটি করাই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিজ্ঞতা বলছে, শক্ত কোনো টেবিল, ডেস্ক বা ভারী কিন্তু স্থিতিশীল আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং মাথা সুরক্ষিত রাখা অনেক ক্ষেত্রে আঘাতের ঝুঁকি কমায়। ঘরের ভেতরে থাকলে বিম বা পিলারের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া নিরাপদ হতে পারে, কারণ এগুলো ভবনের শক্তিশালী অংশ হিসেবে বিবেচিত।
রান্নাঘরে থাকলে মুহূর্ত দেরি না করে গ্যাসের চুলা বন্ধ করা এবং নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকলে স্কুলব্যাগ বা হাত দিয়ে মাথা ঢেকে শক্ত বেঞ্চ বা টেবিলের নিচে অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। বাইরে থাকলে গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, উঁচু ভবন কিংবা নির্মীয়মাণ স্থাপনার কাছাকাছি না গিয়ে খোলা জায়গা বেছে নেওয়াই নিরাপদ। শপিং মল, সিনেমা হল, হাসপাতাল বা গার্মেন্টস কারখানার মতো জায়গাগুলোতে হঠাৎ সবাই একসঙ্গে বের হতে চাইলে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের স্থানে দরজার দিকে দৌড় না দিয়ে মাথা ঢেকে অপেক্ষা করা অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা।
ভূমিকম্পের সময় কিছু কাজ একেবারেই না করাই বুদ্ধিমানের। লিফট ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি, কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট মাঝপথে আটকে থাকতে পারে। জানালা, কাচ বা সহজে ভেঙে যায়—এমন জিনিস থেকে দূরে থাকা উচিত। অনেক মানুষ ভয় পেয়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে বড় দুর্ঘটনার শিকার হন, কারণ কম্পনের সময় সিঁড়িই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। মোমবাতি বা দেশলাই জ্বালানো বিপজ্জনক, বিশেষ করে কোথাও গ্যাস লিকেজ থাকলে। আবার ভারী, ভঙ্গুর আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়াও ঠিক নয়, কারণ কম্পনে সেগুলো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পর মানুষ সাধারণত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেন—ঝুঁকি তখনো পুরোপুরি শেষ হয় না। আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন অনেক সময় মূল ভূমিকম্পের মতোই বিপজ্জনক হতে পারে। তাই বাইরে বের হওয়ার পর খোলা জায়গায় অবস্থান করা উচিত। ভবনের ভেতরে ফিরে যাওয়ার আগে দেয়ালে ফাটল, বিম ও কলামের অবস্থা ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি। কোথাও বড় ধস বা ফাটল দেখা গেলে সেই ভবনে প্রবেশ না করাই নিরাপদ। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন।
ভূমিকম্পের পর মানবিক দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি সামনে আসে আহত মানুষদের ক্ষেত্রে। যারা আহত হন, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া এবং প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আগেভাগেই নির্ধারিত কোনো খোলা স্থানে সবাইকে একত্র হওয়ার পরিকল্পনা কার্যকর করা উচিত। সরকারি নির্দেশনা ও গণমাধ্যমে প্রচারিত যাচাই করা তথ্য অনুসরণ করা জরুরি, যাতে গুজব বা ভুল তথ্যের কারণে কেউ বিপদে না পড়ে।
সব মিলিয়ে, ভূমিকম্প এমন এক বাস্তবতা, যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পূর্ব প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণই পারে এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষকে নিরাপদ রাখতে। জীবন রক্ষার এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—ভয় নয়, সচেতনতা।