প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুর-১ আসনে জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা ঘিরে উত্তেজনা চরমে উঠেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার সন্ধ্যার দিকে শ্রীপুর উপজেলার রাখালিয়া চালা এলাকায় শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ রাত পর্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করে। এতে গুরুতর আহত হন কমপক্ষে ১২ জন এবং পুড়িয়ে দেওয়া হয় ১৫টি মোটরসাইকেল। রাজনৈতিক সহিংসতার এই ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে দুই গ্রুপের নেতাকর্মী মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসেন। প্রচারণার সময় পূর্বনির্ধারিত রুট ও কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল আগেই। তার রেশ ধরে প্রথমে বাকবিতণ্ডার সূত্রপাত হয়, পরে তা রূপ নেয় সংঘর্ষে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইটপাটকেল ছোড়া, লাঠিচার্জ এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় এলাকা রণক্ষেত্রের মতো হয়ে পড়ে। আতঙ্কে আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয়রা ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।
গাজীপুর-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী মজিবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, তার প্রচারণায় অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, পেপার নজরুল ও তার ভাই পারভেজের নেতৃত্বে ২০ থেকে ৩০ জন সন্ত্রাসী তাদের মিছিল লক্ষ্য করে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। তিনি জানান, তার অন্তত ৯ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তর, সজিব, সৈকত, নিবীর, রাজীব, তুহিন ও শিবলীর মতো সক্রিয় কর্মীরাও রয়েছেন। এছাড়া হামলাকারীরা ১৫টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, এই হামলা শুধু প্রচারণাকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে ভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত ব্যারিস্টার ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি দাবি করেন, পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল বানচালের উদ্দেশ্যে মজিবুর রহমানের সমর্থকেরা তাদের ৫নং ওয়ার্ড বিএনপি অফিসে ভাঙচুর চালায়। এরপর বাইরে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম, মৌচাক ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সেকেন্দার, এবং পৌর বিএনপির ৫নং ওয়ার্ড সেক্রেটারি কাশেম গুরুতরভাবে মারধরের শিকার হন। তাদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সংঘর্ষস্থল পরিদর্শনকারী স্থানীয়রা জানান, মোটরসাইকেলগুলো আগুনে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিল ভাঙা হেলমেট, জ্বলা টায়ারের টুকরো এবং রক্তের দাগ। আহতদের অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এলাকাবাসীর মতে, এই ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জানা গেছে, সম্প্রতি দলীয় মনোনয়ন বণ্টনকে কেন্দ্র করে গাজীপুর-১ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। মজিবুর রহমান মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে ইশরাকের অনুসারীরা বেশ কিছু প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল—দলের জনপ্রিয় এবং ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষোভের জেরে মাঠে-ময়দানে তীব্র উত্তাপ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় পৌঁছেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময় এসব সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি, বিশেষ করে গ্রুপিং বা কোন্দলের কারণে যাতে সহিংসতা না বাড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে।
পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সাথে সাথে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে সেই সময় পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে গেছে। স্থানীয় থানার একজন কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে এবং দোষীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
এলাকাবাসীর মতে, সচরাচর শান্তিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত রাখালিয়া চালা এখন আতঙ্কের নগরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী রাতের বেলা দোকান খোলার সাহস পাচ্ছেন না। অভিভাবকেরা সন্তানদের বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করছেন। সাধারণ মানুষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের বার্তা—নির্বাচন মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে; সহিংসতা, দখলদারিত্ব বা ভীতি নয়। রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে, মতের অমিল থাকবে—কিন্তু তার সমাধান কখনোই রক্তপাত, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগে নয়। বরং দলগুলো যদি সংযত এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে সহিংসতা কমবে এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরবে।
গাজীপুর-১ আসনে এই সংঘর্ষ প্রমাণ করেছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন কত সহজে সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। সংঘর্ষের ঘটনায় আহত নেতাকর্মীরা চিকিৎসাধীন থাকলেও, এলাকার মানুষ এখনো ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আগামী নির্বাচনে এই ঘটনার প্রভাব কেমন হবে, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। প্রার্থীদের প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে যেতে পারে।
সার্বিকভাবে, রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজকেই বিষাক্ত করে তোলে। গাজীপুরের ঘটনাটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভাবতে বাধ্য করবে—সংঘর্ষে যে ক্ষতি হয়, তা কখনোই রাজনৈতিক লাভ দিয়ে পূরণ করা যায় না।