গাজা যুদ্ধের ক্ষত: মানসিক সংকটে ৮৫ হাজার ইসরাইলি সেনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৫ বার
গাজা যুদ্ধের ক্ষত: মানসিক সংকটে ৮৫ হাজার ইসরাইলি সেনা

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলমান গাজা যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনের মানুষের জীবনই ধ্বংস করেনি, ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ে ফেলেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ভেতরও। যুদ্ধের চাপ, দীর্ঘদিনের টানা সামরিক অভিযান, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া সহকর্মীদের স্মৃতি, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অবিরাম সংঘাত—সব মিলিয়ে ইসরাইলি সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য বলছে, মানসিক চিকিৎসা গ্রহণ করা সেনার সংখ্যা দুই বছরে প্রায় ৮৫ হাজারে পৌঁছেছে, যা দেশটির সামরিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন বিভাগের উপ-প্রধান তামার শিমোনি এক সাক্ষাৎকারে জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর প্রথম ১৪ মাসেই প্রায় ৬২ হাজার সেনাকে মানসিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সংখ্যা দ্রুত বেড়ে এখন ৮৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। শিমোনির ভাষায়, এই সংখ্যা ‘অভূতপূর্ব এবং উদ্বেগজনক’, যা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ভেতরে গভীর মানসিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে।

তিনি আরও জানান, যুদ্ধ–পরবর্তী মানসিক আঘাত, ভয়, হতাশা, অতীত স্মৃতি ভীতি, ঘুমের ব্যাধি, তীব্র উদ্বেগ, পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা মানসিক রোগকে ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। শিমোনির মতে, বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে একজন থেরাপিস্টকে একসঙ্গে ৭০০–৭৫০ রোগীর চিকিৎসা করতে হচ্ছে, যা কার্যত অসম্ভব। অনেক থেরাপিস্টের রোগীর সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি, ফলে যাদের জরুরি মানসিক সহায়তা প্রয়োজন, তারা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ সম্প্রতি দেশটিতে ‘বিপুল মানসিক স্বাস্থ্য সংকট’ নিয়ে সতর্ক করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এখন মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করছেন, যার মধ্যে বড় অংশই সেনা ও যুদ্ধক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করে, গাজায় চলমান যুদ্ধ পুরো ইসরাইলি সমাজকে মানসিকভাবে অস্থির করে তুলেছে; সেনাদের পরিবারগুলোর মধ্যেও আতঙ্ক, শোক ও অনিশ্চয়তার চাপ বাড়ছে।

অন্যদিকে ইসরাইলি গণমাধ্যমে সেনাদের আত্মহত্যার সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ইসরাইলের প্রভাবশালী দৈনিক মারিভ শনিবার জানিয়েছে, কয়েকদিন আগে মানসিক চাপে এক সেনা আত্মহত্যা করেছেন। এর আগের সপ্তাহেও আরেকজন সেনার মৃত্যু ঘটে, যা পরবর্তীতে আত্মহত্যা হিসেবে নিশ্চিত হয়। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা সেনাদের মানসিক ভেঙে পড়া অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে সংঘাতের নির্মম বাস্তবতা।

অক্টোবর মাসে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, গত ১৮ মাসে ২৭৯টি আত্মহত্যার চেষ্টা রেকর্ড করা হয়েছে এবং এর মধ্যে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই তথ্য দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গাজার যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সেনাদের মানসিক স্থিতিশীলতা ততই বিপর্যস্ত হচ্ছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা তাদের মনের গভীরে এমন ক্ষত তৈরি করছে যা দ্রুত সারার নয়।

ইসরাইলি সমাজে এখন যে মানসিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাদের নয়, বরং চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কাঠামোর ওপরও মারাত্মক চাপ ফেলছে। থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ওপর কাজের চাপ এতটাই বেড়েছে যে তারা অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে পারছেন না। ফলে সেনাদের একটি বড় অংশ চিকিৎসা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ চিকিৎসা পাওয়ার কারণে আরও গভীর মানসিক রোগের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

যুদ্ধের বাইরে, ইসরাইলি সমাজে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে আরেকটি প্রশ্ন: এই মানসিক ভেঙে পড়া পরিস্থিতি কি সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মানসিকভাবে অস্থিতিশীল সেনা নিয়োগ করা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এতে ভুল সিদ্ধান্ত, অনিচ্ছাকৃত হামলা, সহকর্মীর ওপর ক্ষোভ, আত্মহত্যার ঝুঁকি এবং আচরণগত আকস্মিকতা বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি যুদ্ধ পরিচালনাতেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

গাজার পরিসংখ্যানও মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় নিহত হয়েছে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি; যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ, যাদের অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। গাজায় এই বিপর্যয় ইসরাইলি সেনাদের মানসিক আঘাতের অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, মানবিক বিপর্যয়ের দৃশ্যমানতা এবং সামরিক সিদ্ধান্তের নৈতিক জটিলতা অনেক সেনাকে আত্মিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি সমাজের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনিদের জীবনকেই ধ্বংস করছে না; ইসরাইলের ভেতরেও যুদ্ধ এক নীরব মানসিক মহামারি তৈরি করেছে, যার প্রভাব বহু বছর ধরে বহন করতে হবে দেশটিকে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ বন্ধ না হলে এই মানসিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে, সেনাদের আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়বে এবং স্বাস্থ্য–ব্যবস্থার চাপ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইতোমধ্যেই দশকের পর দশক মানবিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে; এখন তাতে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি সংকট—মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়।

গাজায় যা ঘটছে, তা ফিলিস্তিন এবং ইসরাইল উভয় জনগোষ্ঠীর জন্যই গভীর ক্ষত তৈরি করছে। যুদ্ধের আগুন নির্বাপণ হওয়ার পরও এই ক্ষত বহু বছর ধরে মনে, সমাজে এবং রাষ্ট্রের ভেতরে রয়ে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত