জঙ্গি দমন না সাজানো অভিযান? রাষ্ট্রীয় অপব্যবহারে সত্য উদঘাটনের তীব্র দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬২ বার
মেজর (অব.) জিয়াউল হক

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, সাজানো অভিযান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা—এসব ইস্যু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এসব অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে ৯ ডিসেম্বর, সোমবার, যখন জাতীয় প্রেসক্লাবে মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা এবং তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি একত্র হয়ে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে তারা বলেন, গত দুই দশকে নিরাপত্তা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নামে যে সব অভিযানের কথা বলা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ ছিল সাজানো, পরিকল্পিত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। এসব অভিযানের পর রাষ্ট্রীয় বিবরণীর সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের স্পষ্ট অমিল পাওয়া গেছে, যা এখন ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার ধারণাকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন, দেশের বহু মানুষকে তথাকথিত “জঙ্গি দমন” অভিযানের নামে গ্রেপ্তার, গুম, নির্যাতন বা হত্যা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত হয়নি অথবা তদন্ত হয়েছে একতরফা, দায়মুক্তিপূর্ণ ও সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অভিযানের আগেই অভিযুক্তদের নাম, পরিচয়, অপরাধের ধরন এবং ঘটনাস্থলের বিবরণ তৈরি করা ছিল। অভিযানের পরে প্রকাশিত সরকারি বিবরণীতে সেই আগের স্ক্রিপ্ট অনুসারেই তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে বোঝা গেছে, এসব অভিযান প্রকৃত অপরাধ দমনের বদলে একটি বিশেষ ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত হয়েছে।

বক্তারা বলেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহার করা হলে তা কেবল ব্যক্তির অধিকারই ক্ষুণ্ন করে না, বরং গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি আস্থা ভেঙে দেয়। বহু মানুষ অভিযোগ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো ছিল রাজনৈতিক পক্ষপাত, ব্যক্তিগত বিরোধ বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থরক্ষার ফল। অথচ এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য নিরপেক্ষ কোনো প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়নি। তদন্ত সংস্থা যেমন ইচ্ছা অভিযোগ সাজিয়েছে, আদালত পূর্বনির্ধারিত কাঠামোয় বিচার প্রক্রিয়া চালিয়েছে, আর অভিযুক্তরা বছরের পর বছর কারাগারে থেকেও ন্যায়বিচার পাননি।

মেজর (অব.) জিয়াউল হকের ঘটনা সংবাদ সম্মেলনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। তিনি সামরিক জীবনে মেধা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য পরিচিত ছিলেন। দেশের অন্যতম সেরা সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা হঠাৎ করেই কীভাবে ‘জঙ্গি নেতা’ হিসেবে চিহ্নিত হলেন—এই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন। বক্তারা বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত প্রমাণগুলো অত্যন্ত দুর্বল, অসংগত এবং বহু ক্ষেত্রে মনগড়া। বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার দেওয়া বিবরণীতে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। কখনো বলা হয় তিনি এক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, আবার অন্য সময় দাবি করা হয় তিনি আরেক উগ্র সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন। এমনকি তার উপস্থিতি, অবস্থান এবং কর্মকাণ্ডের সময়ও বিভিন্ন রিপোর্টে মিল পাওয়া যায় না। বহু ঘটনাই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে তা বিচারের কাঠামোর চেয়ে নাটকীয় প্রচারণার মতো মনে হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বক্তারা আরও বলেন, বহু অভিযানে যেসব মানুষ নিহত বা আটক হয়েছেন, তাদের পরিবার ঘটনাগুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, অভিযানের দিন ওই ব্যক্তির উপস্থিতি সরকারি বিবরণীর সঙ্গে মেলে না, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অনেক আগে থেকেই আটক রাখা হয়েছিল, আবার অনেককে তুলে নিয়ে পরে “অভিযানে নিহত” দেখানো হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্টে অভিযুক্তদের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। এইসব পরিবর্তন থেকে প্রমাণিত হয় যে তদন্তের প্রক্রিয়াটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সঠিক তথ্যপ্রমাণ যাচাইবাছাইয়ের প্রতি উদাসীন।

অভিযানের সময় পুরস্কার ঘোষণার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বক্তারা বলেন, বিভিন্ন অভিযানের সময় যে ২০ লাখ টাকার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, তার কোনো লিখিত আদেশ, অফিসিয়াল প্রমাণ বা অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এমনকি অনেক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে পুরস্কার ঘোষণাগুলো ছিল মৌখিক, অপ্রমাণিত এবং কার্যত জনমনে নাটকীয়তা সৃষ্টির উপায় মাত্র। এই ধরনের প্রচার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে বরং অস্বচ্ছতা ও উদ্দেশ্যমূলকতা বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী এসব অভিযানের আচরণ অনুসন্ধান করলে গুরুতর ব্যত্যয় দেখা যায়। মানবাধিকার আইন অনুসারে গ্রেপ্তার, আটক, রিমান্ড, তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে ঠিক উল্টো চিত্র—বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার, দীর্ঘ রিমান্ড, অস্বচ্ছ জিজ্ঞাসাবাদ, আইনজীবীর উপস্থিতি নিশ্চিত না করা এবং আদালতের আদেশকে উপেক্ষা করে তদন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ইচ্ছামতো চলা। এসব ঘটনায় দেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করেছে।

বক্তারা বলেন, দেশের জনগণ ন্যায়বিচার চায়। তারা জানতে চায়, এত মানুষ কেন, কীভাবে এবং কার হাতে নিহত হলো। তারা চায় সত্য উদঘাটিত হোক, অযথা অভিযুক্ত মানুষ ন্যায়বিচার পাক, আর যারা প্রকৃত অপরাধী—তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিরপরাধ মানুষকে দোষারোপ করলে প্রকৃত অপরাধীরাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে বক্তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তোলেন। তারা বলেন, প্রথমত, গত এক দশকের সব “জঙ্গি দমন অভিযান” নিরপেক্ষভাবে পুনরায় তদন্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সব মামলা বাতিল করতে হবে। তৃতীয়ত, সাজানো ও অসঙ্গত মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনা করে ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা ও দায় নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা যায়। বক্তারা বলেন, সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো ছাড়া ন্যায়বিচারের পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। এ লড়াই কেবল একজন ব্যক্তির জন্য নয়—এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা, মানবিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক অধিকারের জন্য প্রয়োজনীয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত