প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশ্লেষক, নির্বাচনী প্রশাসন এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে প্রবল আগ্রহ ও প্রতীক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা আরও বেগবান হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাম্প্রতিক ঘোষণা দিয়ে। তিনি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হবে। দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক উৎসবকে ঘিরে এই ঘোষণাটি স্বাভাবিকভাবেই সর্বস্তরে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আসেন সিইসি। সেখানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন তিনি। সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সিইসি জানান, এই সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ সৌজন্যমূলক, কারণ প্রধান বিচারপতি শিগগিরই অবসরে যাচ্ছেন এবং যৌথভাবে বিভিন্ন সময়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান জানাতেই তিনি এ সাক্ষাতে আসেন। সিইসি স্পষ্টভাবে জানান, নির্বাচন সম্পর্কিত কোনো মামলা বা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের সূত্র বলছে, তফসিল ঘোষণার যাবতীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদও একই তথ্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার আগে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, স্থগিত কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক পোস্টাল ব্যালটে রাখা হবে না। নির্বাচন ব্যবস্থাপনার যে অংশটি সব সময় গুরুত্ব পায়, সেই পোস্টাল ব্যালট প্রস্তুত প্রক্রিয়াতেও কমিশন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রহমানেল মাছউদ আরও জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার জন্য সিইসির ভাষণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভাষণটি রেকর্ড করার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। রেকর্ডের নির্ধারিত তারিখ হিসেবে ১০ ডিসেম্বর তাদের ডাকা হয়েছে। এর অর্থ, ভাষণ প্রচারের প্রস্তুতি শেষ হলে তফসিল ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ আরেক তথ্য হলো, বুধবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের সাক্ষাৎ রয়েছে। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে তফসিল ঘোষণা করে। ফলে পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, বুধবারের এই সাক্ষাতের পরই দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
এরই মধ্যে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অবহিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এক বৈঠকে নির্বাচন কমিশন দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিকল্পনা, ভোটার প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সুবিধার ব্যবস্থা, কর্মী প্রশিক্ষণ এবং ভোটের দিন সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তৃত ধারণা দিয়েছে। নির্বাচনের এ প্রস্তুতি নির্বিঘ্নভাবে এগোচ্ছে বলেই নির্বাচন কমিশন আশাবাদী।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, ভোটার এবং রাজনৈতিক দলগুলো অপেক্ষায় আছে তফসিল ঘোষণার নির্দিষ্ট দিনের জন্য। দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন সব সময়ই উত্তেজনার, আলোচনার এবং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। জনগণ একদিকে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রার্থী বাছাই, মনোনয়ন, প্রচারণার কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর এসব কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে গণভোটের অন্তর্ভুক্তির কারণে। বহুদিন পর দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় গণভোট যুক্ত হওয়ায় আইনগত, সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিকভাবে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের সচেতনতা, তথ্যপ্রবাহ ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার ব্যাপারে কমিশন বিশেষ সতর্ক থাকবে বলে জানা গেছে।
সুপ্রিম কোর্টে সিইসির সাক্ষাত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হলেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো মামলাগত বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণ সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচনকালীন বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সিইসির বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে যে নির্বাচনকে নিয়ে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ রাখার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তফসিলের যাবতীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই এবং কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন। সিইসি ভাষণ রেকর্ড হওয়ার পরপরই তফসিল ঘোষণা হবে—যা দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়াবে। তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচনী মাঠ পুরোপুরি সরগরম হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনে কোন দল কীভাবে অংশ নেবে, কারা মনোনয়ন পাবে, কী ধরনের প্রচারণা দেখা যাবে—এসব বিষয় দেশের সাধারণ ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
এখন অপেক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। তফসিল প্রকাশের পর নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি কতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তা-ই হবে দেশের গণতন্ত্রের জন্য বড় পরীক্ষা। তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে নামবে নতুন করে। ভোটের দিন পর্যন্ত উত্তাপ, উত্সাহ ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা দেশজুড়ে চলমান থাকবে।
সবমিলিয়ে বলা যায়—চলতি সপ্তাহেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণায় বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক অভিযাত্রার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি কতটা ফলপ্রসূ হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কতটা দায়িত্বশীল হয়, আর জনগণের অংশগ্রহণ কতটা প্রাণবন্ত হয়—তা-ই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।