সিআইডির ট্রেনিং সেন্টারে রহস্যজনকভাবে এসআইয়ের ঝুলন্ত লাশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
আফতাব উদ্দিন রিগানের ঝুলন্ত লাশ

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর পল্টনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আফতাব উদ্দিন রিগানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘটনাস্থলে পুলিশ, সিআইডি ও বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার সদস্যরা অবস্থান করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ করেন। ৩৫তম আউটসাইড ক্যাডেট হিসেবে যোগদানকারী রিগান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল সিকিউরিটি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। প্রশিক্ষণের জন্য অস্থায়ীভাবে সিআইডির ট্রেনিং সেন্টারের ডরমেটরিতে অবস্থান করছিলেন তিনি।

পল্টন থানার উপ-পরিদর্শক শামীম হাসান জানান, সকালেই ট্রেনিং সেন্টারের ভেতর থেকে একজন সদস্য রিগানের দরজা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। পরে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। ঘটনাস্থলে প্রাথমিক সুরতহাল সম্পন্ন করার পর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কী কারণে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তিনি জানান, রিগান ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, আত্মনিবেদিত এবং দায়িত্বশীল এক পুলিশ কর্মকর্তা। ২০১৭ সালে বাহিনীতে যোগদানের পর থেকে তিনি সাইবার ও স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিটে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছিলেন। তার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলায়। প্রশিক্ষণে অংশ নিতে এসে অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে একই ডরমেটরিতে ছিলেন তিনি। সহকর্মীদের দাবি, তার আচরণ বা কথাবার্তায় আত্মহত্যার কোনো পূর্বাভাস তারা অনুভব করেননি। বরং গত কয়েক দিন তিনি স্বাভাবিকভাবেই ট্রেনিং-সংক্রান্ত সব কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।

ঘটনার খবর পেয়ে ডিবি, সিআইডি এবং পল্টন থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ডিটিএসের কর্মকর্তারা জানান, রাতের বেলা কিংবা ভোরে কোনো অস্বাভাবিক শব্দ বা নড়াচড়া তারা টের পাননি। লাশ উদ্ধারের পর সিআইডি সদস্যরা কক্ষটি সিলগালা করে সেখানে থাকা সমস্ত মালামাল জব্দ করেন। রিগানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ব্যক্তিগত নথিপত্র ও প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত নোটবুকও পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তার ডিজিটাল ডিভাইসগুলো বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হবে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাটি আত্মহত্যা হতে পারে। তবে মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত, মানসিক, পেশাগত বা অন্য কোনো কারণ ছিল কিনা, তা নিশ্চিত হতে সময় লাগবে। এই ধরনের মৃত্যু সাধারণত তিনটি স্তরে তদন্ত করা হয়—ময়নাতদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তার সহকর্মী ও প্রশিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদ। এ ছাড়া তার পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও তদন্তের অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়া হবে।

রিগানের পরিবারও খবর পেয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে তিনি মানসিকভাবে কোনো চাপে ছিলেন কিনা। পরিবারের কাছ থেকে তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রাসঙ্গিক তথ্যও সংগ্রহ করা হবে। দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে তার কর্মস্থল বা ব্যক্তিজীবনে কোনো জটিলতা ছিল কি না, তা তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রিগান ছিলেন খুব সক্রিয় ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। সাইবার তদন্তে তার দক্ষতা প্রশংসিত ছিল। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে যুক্ত ছিলেন। এমন একজন সদস্যকে হঠাৎ এভাবে হারিয়ে পুরো ইউনিটই শোকাহত।

সিআইডির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ডিটিএস অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি করিডোরে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তদন্ত দল সেসব ফুটেজ পরীক্ষা করছে। রাতে বা সকালে কে কোথায় ছিল, কক্ষে কেউ প্রবেশ করেছে কিনা, বা কোনো সন্দেহজনক নড়াচড়া হয়েছে কি না—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর অতি-চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব ও মানসিক চাপ অনেক সময় অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। তবে রিগানের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বিষয়ে এখনও নিশ্চিত জানা যায়নি।

এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরও ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাহিনীর সদস্যের মৃত্যু সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ে পর্যন্ত তদন্তের ওপর নজর রাখা হচ্ছে যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ না পড়ে।

দিনভর ডিটিএসের ভেতরের পরিবেশ ছিল শোকাচ্ছন্ন ও উদ্বেগপূর্ণ। সহকর্মীরা বারবার প্রশ্ন তুলছিলেন—হঠাৎ কেন এমন হলো? প্রশিক্ষণের চাপ, ব্যক্তিগত কিছু, নাকি অন্য কোনো অজানা কারণ? সব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর অনেক প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত