প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতে শুরু করেছে। বিজয়ের উচ্ছ্বাস, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর স্বাধীনতার গৌরবময় চেতনা ছড়িয়ে দিতে সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা, সশস্ত্র বাহিনী, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ ব্যাপক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিশেষ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় জীবনের অত্যন্ত তাৎপর্যময় এই দিনটি পালন করা হবে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করেই এবার মূল আকর্ষণগুলোর বড় অংশ আয়োজন করা হবে, যেখানে দেশপ্রেম, সামরিক শৌর্য আর প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী মিলিত হবে এক বিস্ময়কর দর্শক-অভিজ্ঞতায়।
সরকারি সূত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিজয় দিবসের সকাল ১১টা থেকে শুরু হবে বিশেষ ফ্লাই পাস্ট মহড়া, যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী তাদের সম্মিলিত শৌর্য-গাঁথার প্রতীকী প্রদর্শনী উপস্থাপন করবে। আকাশে রঙিন ধোঁয়ার রেখা, বিভিন্ন বিন্যাসে উড্ডয়ন এবং আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির শক্তিরূপ তুলে ধরার মাধ্যমে এই মহড়া বিজয়ের বার্তা দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেবে। ফ্লাই পাস্ট কর্মসূচি শুধু সামরিক কৌশল ও প্রস্তুতি প্রদর্শনই নয়, এটি জাতীয় গর্বের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে, যা প্রতি বছরই লাখো মানুষের মনে উচ্ছ্বাস জাগায়।
সকাল ১১টা ৪০ মিনিট থেকে শুরু হবে অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ—“টিম বাংলাদেশ”-এর ৫৪ জন প্যারাট্রুপারের স্কাইডাইভিং প্রদর্শনী। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের মানচিত্র ও জাতীয় পতাকার রঙে সজ্জিত বিশেষ পোশাকে আকাশে উড়াল দেবেন প্যারাট্রুপাররা। তারা পতাকা হাতে উন্মুক্ত আকাশ থেকে মাটির দিকে নেমে আসবেন এক মনোমুগ্ধকর কুশল প্রদর্শনের মাধ্যমে। আকাশের নীলপটে ঝরে পড়া লাল-সবুজ পতাকার রঙ বিজয়ের আবহকে আরও জীবন্ত করে তুলবে। শিশুসহ পরিবারের সদস্যদের জন্য এই স্কাইডাইভিং প্রদর্শনী হবে বিশেষ আকর্ষণ, যা প্রতি বছরই দর্শনার্থীদের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়।
এ ছাড়া বিজয় দিবসের বিশেষ ব্যান্ড-শো আয়োজন করা হবে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন ব্যান্ড দলের অংশগ্রহণ থাকবে। দেশাত্মবোধক সুর, সামরিক ব্যান্ডের তাল, এবং স্বাধীনতার স্মৃতিজড়িত আবেগময় সঙ্গীত মিলে তেজগাঁওয়ের অনুষ্ঠানে তৈরি হবে দেশপ্রেমের শক্তিশালী আবহ। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করাই এসব আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।
গতকাল বুধবার বিজয় দিবস কেন্দ্রিক সকল বিশেষ কর্মসূচির সার্বিক প্রস্তুতি পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি। তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। তারা মাঠের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মহড়াস্থলের প্রযুক্তিগত সাজসজ্জা, যান্ত্রিক প্রস্তুতি এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলো ঘুরে দেখেন।
নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান জানান, বিজয় দিবসের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনে রাজধানীতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বিশেষ নজরদারি ও প্রযুক্তি-নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের সার্বিক নিরাপত্তাকে বিবেচনায় রেখে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, বিজয় দিবস শুধু উদযাপনের বিষয় নয়; বরং এটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের স্মারক। তরুণদের কাছে বিজয়ের গল্প নতুনভাবে তুলে ধরতে এবং স্বাধীনতার চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করতে সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাগুলো বিশেষভাবে সাজানো হচ্ছে। তিনি মনে করেন, জাতির ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত করে তুলতে এমন আয়োজনে সৃজনশীল প্রকাশ অত্যন্ত প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি জানান, অনুষ্ঠানে আগত অতিথি ও সাধারণ দর্শনার্থীদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর নজরদারি করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সকল আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং মানুষ নিঃসন্দেহে এক স্মরণীয় বিজয় দিবস কাটাবে।
জাতীয় পর্যায়ে বিজয় দিবস উদযাপনের মূল আকর্ষণ শুধুমাত্র এসব সামরিক বা সাংস্কৃতিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও বিচিত্র কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে দেশাত্মবোধক আয়োজনের মাধ্যমে বিজয়ের চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হচ্ছে।
এই সব আয়োজনের পেছনে রয়েছে একটিই লক্ষ্য—বিজয়ের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে উজ্জ্বল করে তোলা। স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের পথ, দেশের প্রতিষ্ঠায় লাখো মানুষের ত্যাগ ও রক্তদানের ইতিহাস, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে প্রতিটি বাংলাদেশির জীবনে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন সেই ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তি আরও দৃঢ় করে।
১৬ ডিসেম্বরের মূল অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে প্রতিদিনই চলছে মহড়া, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং প্রস্তুতি চূড়ান্তকরণ। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, এ বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকার দর্শনার্থীদের অনুরোধ করেছে, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা, নির্ধারিত পথে প্রবেশ করা এবং নিরাপত্তা কর্মীদের নির্দেশনা অনুসরণ করার জন্য।
দেশব্যাপী এ ধরনের প্রস্তুতি এবং নাগরিকদের উৎসাহ দেখে স্পষ্ট—মহান বিজয় দিবস শুধুই একটি তারিখ নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, শক্তি ও স্বাধীন সত্তার প্রতীক। একাত্তরের বিজয়ের সেই জয়গান এখনো নতুন দিনের পথচলায় আলো ছড়ায়।