প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কার্যালয়ের সামনে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটে গেল এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। হঠাৎ করেই শ খানেক মানুষের ভিড় জমে উঠে বিসিবি ভবনের মূল ফটকের সামনে। কোনো ব্যানার নেই, নেই কোনো পরিচয়-সংবলিত প্ল্যাকার্ড; অচেনা এসব মানুষের উদ্দেশ্যও শুরুতে ছিল অস্পষ্ট। ঠিক দুপুর ১২টার দিকে তারা একযোগে বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন এলাকার পরিবেশ। বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সদ্য পদত্যাগী যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং বিসিবির সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ।
বিক্ষোভকারীরা হঠাৎ করেই উচ্চকণ্ঠে অভিযোগ তুলতে থাকেন দুর্নীতির, প্রশাসনিক অনিয়মের এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। তবে তাদের মধ্যে কেউই স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তারা কারা, কোথা থেকে এসেছে বা হঠাৎ করে এই বিক্ষোভের কারণ কী। সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে যখন নাম-পরিচয় জানতে চান, কেউই এগিয়ে আসেননি। বরং সবাই এক ধরনের গোপনীয়তা বজায় রেখে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে এড়িয়ে যান। তবুও স্লোগানের ভাষা ও ভিড়ের গতি দেখে অনুমান করা যায়, বিক্ষোভটি ছিল সংগঠিত, হঠাৎ করেই যেন সাজানো মঞ্চে ঘটনাটি ঘটে গেছে।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, সদ্য পদত্যাগী যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নাকি নানা অনিয়ম জড়িত। তারা দাবি করেন, তার পদত্যাগের পরদিনই এ ধরনের প্রতিবাদ জানানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে কারণ দীর্ঘদিন ধরে তারা তার ‘দুর্নীতির’ বিচার দাবি করে আসছেন। যদিও এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি। প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, তদন্ত হলেই সত্য প্রকাশ হবে। এ সময় কিছু ব্যক্তি নতুন করে জোর দিয়ে বলেন যে, বিসিবির ভেতরেও অনিয়ম চলছে এবং তা দেখতে পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যদিও তাদের বক্তব্য ছিল ভীষণ অসংলগ্ন এবং অসংগঠিত।
ঘটনার আরেকটি বিশেষ দিক ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ি। বিসিবি ভবনের ভেতরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। বিসিবি চত্বরে তারা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে বিক্ষোভকারীদের বিসিবি ভবনে প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও দেখা যায় অবস্থান নিতে, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়। যদিও বিক্ষোভটি ছিল শান্তিপূর্ণ, তবুও হঠাৎ করেই এমন আয়োজন কেন—সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিকরা এবং বিসিবি সংশ্লিষ্ট কাজ করা কর্মকর্তারা।
বিক্ষোভের সময় বিসিবির কোনো কর্মকর্তা বাইরে এসে বক্তব্য দেননি। বোর্ড অফিসের ভেতর সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। কর্মকর্তাদের মুখে উদ্বেগের ছাপ দেখা গেলেও কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে চাননি বিক্ষোভের পেছনে কোনো সংগঠিত চক্র আছে কি না। যদিও বিসিবির ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তন, পদত্যাগ এবং বোর্ডের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তকে ঘিরে ভেতরের চাপ ও বাইরের চাপ মিলেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কিছু যুবক দাবি করেন, বিসিবির কার্যক্রমে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য ছিল বারবার একই, কিন্তু ভিত্তিহীন ও অসংলগ্ন। তারা জানান, বিসিবিকে ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগকে তারা ‘সাময়িক স্বস্তি’ হিসেবে দেখছেন, কিন্তু তদন্ত ছাড়া সমস্যা সমাধান হবে না বলেও জানান। অন্যদিকে, সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধেও তারা একই ধরনের অভিযোগ আনেন, যদিও এর কোনো ভিত্তি সংবাদমাধ্যম যাচাই করে পায়নি।
বিক্ষোভ শেষ হয় প্রায় দেড় ঘণ্টা পর। বিক্ষোভকারীরা যে হঠাৎ করেই এসেছিলেন, তেমনি হঠাৎ করেই সরে যান। তাদের প্রস্থানও ছিল সংগঠিত, যেন কোনো ইঙ্গিতে তারা স্থান ত্যাগ করছেন। এলাকাজুড়ে তখনও ছিল সতর্কতা। সেনাবাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখেন এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিসিবির ভেতর-বাইরে নজরদারি চালান।
ঘটনাটিকে ঘিরে ক্রিকেট অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বিসিবিকে ঘিরে সাম্প্রতিক নানা বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন রয়েছে অনেকদিন ধরেই। কোচ নির্বাচন, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা, টিম ম্যানেজমেন্টসহ অনেক বিষয়ের সমালোচনা হয়েছে গত কয়েক মাসে। হঠাৎ করে এমন বিক্ষোভ সেই বিতর্কগুলোকেই যেন আরও উসকে দিয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে নতুন প্রশ্ন—এটি কি বৃহত্তর কোনো অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নাকি অন্য কারও পরিকল্পিত উদ্যোগ?
ঘটনাস্থলে যেসব সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন, তারা মনে করছেন এই বিক্ষোভের পেছনে সুস্পষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা সংগঠনিক উদ্দেশ্য ছিল। আবার অনেকে মনে করছেন এটি হয়তো কোনো ভিন্নমতের চাপ সৃষ্টি বা কোনো পক্ষের প্রতি অসন্তোষের প্রতিফলন। তবে বিক্ষোভকারীদের পরিচয় গোপন থাকায় বিষয়টির সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বিসিবির ভেতরের পরিবেশও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি যেমন প্রশ্ন তুলছে, তেমনি সামনে আরও বড় কোনো ঘটনা ঘটতে পারে কিনা, সেটাও ভাবাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। বিসিবির একজন কর্মকর্তার মতে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং নীতিগত দ্বন্দ্বের কারণে বোর্ডের ভেতরে বেশ অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই অস্থিরতা বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই হয়তো কঠোর নিরাপত্তা জারি করা হয়েছে।
তবে ঘটনার পর বিসিবি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। সাংবাদিকরা অপেক্ষা করছেন বোর্ড থেকে স্পষ্ট বক্তব্যের, যাতে বোর্ডের অবস্থান পরিষ্কার হয় এবং ফুটে ওঠে বিক্ষোভের প্রকৃত কারণ।
মিরপুর শেরে-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আশপাশে এই ধরনের আকস্মিক ঘটনা সাধারণত কমই দেখা যায়। আজকের ঘটনাটি তাই শুধু ক্রিকেটাঙ্গন নয়, বরং দেশের ক্রীড়া প্রশাসন নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নতুন প্রশ্ন উঠেছে—ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় একটি খেলার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সামনে যদি এমন অঘটন ঘটে, তাহলে তার পেছনে আসলেই কী ঘটছে?
বিক্ষোভ শুরুর পর যেমন অজানা ছিল এর উদ্দেশ্য, ঠিক তেমনই এর সমাপ্তিও ছিল অনাকাঙ্খিতভাবে নীরব। কিন্তু প্রশ্ন রেখে গেল অনেক। তদন্ত বা ব্যাখ্যা ছাড়া বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই হঠাৎ ঘটনার পর বিসিবির ভেতর ও বাইরে অস্থিরতা আরও বাড়লো, যা ক্রিকেটপ্রশাসনের ওপর নতুনভাবে চাপ সৃষ্টি করবে।