প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরের তারাগঞ্জে সাবেক প্রধান শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় এবং তার স্ত্রী সুবর্ণা রায় হত্যার ঘটনায় অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছে একজন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রাত ১টার দিকে আলমপুর ইউনিয়নের ফাজিলপুর শেরমস্ত গ্রাম থেকে মোরসালিন ইসলাম (২৫) নামের ওই যুবককে আটক করে।
মোরসালিন ওই গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে। পেশায় তিনি টাইলস মিস্ত্রি এবং পাশাপাশি তারাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ডিবি পুলিশ জানায়, কয়েক দিন আগে মোরসালিন মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্রের বাড়িতে টাইলস লাগানোর কাজ করেছিলেন। কাজ করার সময় বাড়িতে প্রচুর টাকা-পয়সা আছে—এমন ধারণা থেকে তার মনে লোভ জাগে। সেই লোভ থেকেই তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন।
গত শনিবার রাত ১০টার দিকে নিজের বাড়ির একটি চায়নিজ কুড়াল হাতে নিয়ে মোরসালিন যোগেশ চন্দ্রের বাড়ির পেছনের কাঁঠাল গাছ বেয়ে দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। প্রথমে তিনি সুবর্ণা রায়কে এবং পরে যোগেশ চন্দ্র রায়কে কুপিয়ে হত্যা করেন। হত্যার পর তিনি আলমারির তালা ভেঙে টাকা-পয়সা লুটের চেষ্টা করেন, কিন্তু ভেতরে কোনো অর্থ না পাওয়ায় খালি হাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ব্যবহৃত কুড়ালটি পাশের পুকুরে ফেলে দেন।
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোরসালিন হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তার পরিবারের আর্থিক সংকট এবং প্রায় ৮ হাজার টাকার ঋণ তাকে এই পথ বেছে নিতে প্ররোচিত করেছে বলে সে জানিয়েছে। রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন মারুফ বলেন, “গত ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা দম্পতিকে কুড়াল দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে মোরসালিন। টাইলসের কাজ করতে এসে বাড়িতে টাকার উপস্থিতি নিয়ে তার ভুল ধারণা তৈরি হয়। সেই লোভ আর ঋণের চাপ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করে। হত্যার পর আলমারির তালা ভেঙে টাকা চুরি করতে গেলে কোনো অর্থ না পাওয়ায় খালি হাতে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুকুরে ফেলা কুড়ালটিও উদ্ধার করা হয়েছে।”
পুলিশ আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।
স্থানীয়রা হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস হিসেবে বর্ণনা করছেন। একাধিক প্রতিবেশী জানান, যোগেশ চন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তার শিক্ষাদীক্ষা এবং মুক্তিযুদ্ধের অবদানের কারণে তিনি এলাকায় সবাইকে প্রেরণা দিতেন। সুবর্ণা রায়ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তারা তাদের জীবনে শান্তি ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়িতে প্রবেশ ও হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি পরিকল্পিত ছিল। এমন ধরনের নৃশংসতা সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। তারা আরও বলছেন, যুবকদের মধ্যে আর্থিক সংকট ও লোভের কারণে কখনো কখনো এমন অপরাধ সংঘটিত হতে পারে, যা সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য গুরুতর হুমকি।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, মোরসালিনকে আদালতে প্রেরণের পর মামলা দায়ের করা হবে। তদন্তে পাওয়া সমস্ত প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ আনা হবে। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রংপুরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনও ধরনের উত্তেজনা বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
মোকাবিলায় ডিবি পুলিশ বলেছে, তাদের লক্ষ্য দ্রুততম সময়ে হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে, তারা আশ্বস্ত করেছে যে যেকোনও সহযোগী থাকলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
উপসংহারে বলা যায়, রংপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাজকে সতর্ক করছে যে আর্থিক লোভ, ব্যক্তিগত সংকট ও পরিকল্পিত অপরাধ কেবল দম্পতি পরিবারকে নয়, পুরো সম্প্রদায়কে আঘাত করতে পারে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নেওয়া নাগরিকদের জন্য আইনশৃঙ্খলার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে অপরিহার্য।