প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা, সমীকরণ আর হিসাব–নিকাশের মধ্যেই বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিএনপির আসন বণ্টন ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির পাশে থাকা শরিক দলগুলো নির্বাচনের প্রাক্কালে নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ ও হতাশার মুখোমুখি হয়েছে। দলটির ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় শরিকদের নাম না থাকায় এই অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে। বিএনপি বলছে, কৌশলগত কারণে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নাম প্রকাশ করা হয়নি। অপরদিকে শরিকরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে, আর এতে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসের পরিস্থিতি।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিএনপি তিন দফায় ২৭৩টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দলটির সর্বশেষ ঘোষণায়ও শরিকদের কোনো আসন চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপি বলছে, ২৭টি আসন এখনো শূন্য রাখা হয়েছে এবং এসব আসনের কিছু শরিকদের জন্য বরাদ্দ করা হতে পারে। তবে ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় শরিকদের নিজের নির্বাচনী এলাকায় অন্য প্রার্থী ঘোষণা হওয়ায় তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
শরিকদের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা যায় লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের বক্তব্যে। তিনি বলেন, “আমরা তো ১৭ বছর ধরে কিছু চাইনি। যখন রেজাল্টের সময় এসেছে, তখন দেখলাম বিএনপি তার সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এখন বলছে, তারা কিছু আসন খালি রেখেছে। কিন্তু আমার আসনেই তো প্রার্থী দেয়া হয়েছে। তাহলে আমরা কোন ভিত্তিতে নির্বাচন করব?” তার ভাষায়, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি নৈতিকতারও প্রশ্ন। বহু বছর ধরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পর নির্বাচনের মুহূর্তে এমন অবহেলা—একে তিনি বিশ্বাসঘাতকতার সমান বলেই উল্লেখ করেন।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পরিস্থিতিকে আরও কঠোর ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, “বিএনপি চাইছে কোনোরকমে দু-চারটা, পাঁচটা বুস্ট দিয়ে পরিস্থিতি ম্যানেজ করা। এই ম্যানেজ করার চিন্তাটা যুগপতের শরিকদের ক্ষুব্ধ করেছে।” তিনি মনে করেন, বিএনপি যেভাবে শরিকদের উপেক্ষা করছে, তাতে একটি অনাস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দলটি কি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্ধুহীন নীতি’ অনুসরণ করছে? তার এই প্রশ্ন শরিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
অন্যদিকে বিএনপি বলছে, শরিকদের যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বিচার করেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দিতে চায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, যে সব শরিক জয়ের সক্ষমতা রাখে, তাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এটি ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, “শরিকদের নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালাতে বলা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য নির্বাচন জেতা, তাই যাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদেরই আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হবে।”
টুকুর বক্তব্য শরিকদের কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা হলেও শরিকদের মতে এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশলের কথা। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় যে প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছিল, দল এখন সেগুলো মানছে না। বহুদিন ধরেই বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে আন্দোলন করেছে এসব দল। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আহ্বান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি, সরকারের বিরুদ্ধে মানববন্ধন, সমাবেশ, লংমার্চ—সব জায়গাতেই শরিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু আজ নির্বাচন সামনে রেখে যেভাবে তাদের আসন বণ্টন নিয়ে ‘দ্বিধা-দ্বন্দ্ব’ তৈরি হয়েছে, তা শরিকদের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল সমস্যা হলো, শরিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা তুলনামূলক কম—এ কারণে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, শরিকদের আসন ছাড়লে তারা জিততে পারবে কি না। আঞ্চলিক বাস্তবতা, দলীয় সংগঠন, ভোট কাঠামো—এসব বিবেচনায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব অনেক ক্ষেত্রে শরিকদের মনোনয়নের বিষয়ে ইতস্তত করছে। পাশাপাশি আরপিও সংশোধনীর কারণে প্রতিটি দলকে নিজেদের মার্কায় ভোট করতে হবে—এক্ষেত্রে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ ব্যবহার করতে পারছে না শরিকরা। ফলে ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
অনেকে মনে করেন, জামায়াতের শক্ত অবস্থান, ইসলামী আন্দোলন এবং আট দলের মোর্চার উন্নত সাংগঠনিক সক্ষমতা বিএনপিকে আরও চিন্তায় ফেলেছে। শরিকদের আসন না দিলেও—আরও শক্তিশালী উদীয়মান দলগুলোর উপস্থিতি বিএনপির নির্বাচনী কৌশলকে জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতি বিএনপির নেতৃত্বের জন্যও সহজ নয়। একদিকে দীর্ঘ আন্দোলনে থাকা শরিকদের তুষ্ট করা জরুরি, অন্যদিকে নির্বাচনের মাঠে বাস্তব প্রতিযোগিতায় জেতার মতো প্রার্থী বাছাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শরিকদের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়তে থাকলে যুগপৎ আন্দোলনের ঐক্যেও ফাটল ধরতে পারে—এমন আশঙ্কা রাজনীতিবিদদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
বিএনপি বলছে, বাকি থাকা ২৭টি আসনের মধ্য থেকেই শরিকদের আসন দেওয়া হবে। কিন্তু শরিকরা বলছে, এর আগেও তারা আশ্বাস পেয়েছে, ফল হয়নি। ফলে তারা মাঠে নামতে পারছে না, প্রচারণায় নিশ্চিত অবস্থানও নেই। এই অনিশ্চয়তা তাদের রাজনীতিতে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচন–কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিএনপি ও শরিক দলগুলোর এই সম্পর্কের উত্তেজনা ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই চাপ বাড়ছে বিএনপির ওপর—শরিকদের ক্ষোভ কমিয়ে কীভাবে নির্বাচন–সমীকরণ সামলাবে দলটি, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।