প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরেকটি ভয়াবহ আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর সংঘটিত সশস্ত্র হামলার ঘটনাকে। শুক্রবার সংঘটিত এই বর্বরোচিত হত্যাচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রাথমিক তথ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সংঘটিত অপরাধ নয়; বরং এটি সংস্কৃতি, মতাদর্শ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের কণ্ঠরোধের একটি গভীর ও পরিকল্পিত প্রয়াস।
ঘটনার পরপরই সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ১৩ অক্টোবর এক যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে সংগঠনের পরিচালক শিল্পী জাহিদুল ইসলাম এবং সহকারী পরিচালক শিল্পী হাফেজ নিয়ামুল হোসাইন গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, শরীফ ওসমান হাদি একজন রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় সংস্কৃতির পক্ষে এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নির্ভীক কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে আসছেন। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে তিনি যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, তা দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে একটি বিকল্প ও গণমুখী ধারা সৃষ্টি করেছে।
সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর বিবৃতিতে বলা হয়, হাদির ওপর হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত সেই সব শক্তির প্রতিফলন, যারা সংস্কৃতির নামে একধরনের ফ্যাসিবাদী মনোভাব লালন করে এবং ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, গত কয়েক বছরে সাংস্কৃতিক পরিসরে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হয়েছে। দেশীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের পক্ষে যারা সোচ্চার, তারা নানা রকম হুমকি, চাপ ও আক্রমণের মুখে পড়ছেন। হাদির ওপর এই হামলা সেই ধারাবাহিকতারই একটি ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে সাইমুমের দায়িত্বশীলরা আরও বলেন, শরীফ ওসমান হাদি কেবল একজন সংগঠক নন, তিনি একজন চিন্তাশীল সাংস্কৃতিক কর্মী, যিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তার নেতৃত্বে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন, আলোচনা সভা ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা রক্ষার চেষ্টা করে আসছে। এই কারণে তিনি সেই সব গোষ্ঠীর জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছেন, যারা বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণকে আধুনিকতা বলে প্রচার করতে চায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক। হামলাকারীরা সশস্ত্র ছিল এবং হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আক্রমণ চালায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে এটি সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, যারা সংস্কৃতির মুখোশ পরে ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে কাজ করছে, তারা হাদির মতো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে ভয় পায়। তাই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই ‘টার্গেট কিলিং’-এর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তারা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, বুলেটের ভয় দেখিয়ে কোনো সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থামানো যাবে না। দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
এই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষায় এখনই দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি। অন্যথায় সহিংসতা ও ভয়ের সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হবে, যা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি।
সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী তাদের বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজসহ সব প্রযুক্তিগত প্রমাণ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের হামলার সাহস না পায়। সংগঠনটি মনে করে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
মানবিক দিক থেকেও বিবৃতিতে আবেগঘন ভাষায় হাদির সুস্থতার কামনা করা হয়। মহান আল্লাহর দরবারে তার দ্রুত আরোগ্য ও দীর্ঘ হায়াতে তায়্যেবা কামনা করা হয়। একই সঙ্গে তার পরিবার ও সহকর্মীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়, যারা এই কঠিন সময়ে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি সতর্কবার্তা। মতাদর্শিক ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভিন্নতাকে সহিংসতার মাধ্যমে দমন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আলোচনার মাধ্যমে, শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই মতবিনিময়ের পথ খোলা রাখা উচিত। হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে যে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর উঠেছে, তা ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক পরিসরে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তি আরও শক্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, শরীফ ওসমান হাদির ওপর হত্যাচেষ্টা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, এটি একটি আদর্শ, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিবাদ সেই আঘাতের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় ও মানবিক অবস্থান, যা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।