প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুবাইয়ের আলোঝলমলে ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের মঞ্চে বাংলাদেশ যুবারা যেন ইতিহাস লিখে রাখল আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য আর সাহসী ক্রিকেটে। শিরোপা ধরে রাখার প্রত্যয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেই আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে ৩ উইকেটে হারিয়েছে আজিজুল হাকিম তামিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। শুধু একটি জয় নয়, এই ম্যাচ বাংলাদেশের যুব ক্রিকেটকে এনে দিয়েছে গর্বের নতুন এক রেকর্ড—যুব এশিয়া কাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের কীর্তি।
টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দল। শুরুতে বাংলাদেশি বোলারদের নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেন্থে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি তারা। ইনিংসের প্রথম ভাগে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারালেও তিন নম্বরে নামা ফয়সাল শিনোজাদা দৃঢ়তা ও আগ্রাসনের এক অনন্য মিশেলে দলকে টেনে তোলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন আফগান ব্যাটিংয়ের মূল ভরসা। ৮টি চার ও ৪টি ছক্কায় মাত্র ৯৪ বলে ১০৩ রানের ঝকঝকে সেঞ্চুরি করেন শিনোজাদা। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে এটি ছিল তার ষষ্ঠ ইনিংস এবং তৃতীয় শতক, যা যুব ওয়ানডে ক্রিকেটে নির্দিষ্ট কোনো দলের বিপক্ষে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির বিরল রেকর্ড।
শিনোজাদার ইনিংসের সঙ্গে আফগানিস্তানের স্কোরবোর্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন উজাইরউল্লাহ নিয়াজাই, যিনি ৪৪ রান করেন। আজিজুল্লাহ মিয়াখিল খেলেন ৩৬ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস, আর শেষদিকে আব্দুল আজিজ ১৬ বলে ২৬ রান যোগ করে দলের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করেন। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে আফগানিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৮৩ রান, যা অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে বড় লক্ষ্য বলেই বিবেচিত।
বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে ইকবাল হোসেন ইমন ও শাহরিয়ার আহমেদ ছিলেন সবচেয়ে সফল। দুজনেই ২টি করে উইকেট শিকার করেন এবং মধ্য ওভারগুলোতে রান প্রবাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তবু শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের স্কোর বাংলাদেশের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
২৮৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা। ওপেনার জাওয়াদ আবরার ও রিফাত বেগ শুরু থেকেই ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে খেলতে থাকেন। আফগান বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করে তারা দ্রুত রান তুলতে থাকেন। মাত্র ১৫ ওভারের মধ্যেই এই দুই ওপেনার দলের স্কোর একশ পার করে দেন, যা ম্যাচের গতিপথ অনেকটাই বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ১৬০ বলে ১৫১ রানের এই উদ্বোধনী জুটি ছিল বাংলাদেশের রান তাড়ার ভিত্তি।
রিফাত বেগ ৫টি চার ও ২টি ছক্কায় ৬৮ বলে ৬২ রান করে আউট হন। তার বিদায়ের পরও চাপ কমেনি, কারণ অপর প্রান্তে দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাওয়াদ আবরার। কিছুক্ষণ পর ছক্কা মারতে গিয়ে লং অফে ধরা পড়েন তিনি। ৯টি চার ও ৬টি ছক্কায় ৯৬ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন জাওয়াদ, যা বড় রান তাড়ায় বাংলাদেশের সাহসের প্রতীক হয়ে থাকবে।
দুই ওপেনার ফিরে গেলেও বাংলাদেশের ইনিংস তখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। অধিনায়ক আজিজুল হাকিম তামিম ও কালাম সিদ্দিকি এলিন মিলে গড়ে তোলেন ৭১ বলে ৬৬ রানের কার্যকর জুটি। এই জুটি বাংলাদেশকে জয়ের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। এলিন ৩৬ বলে ২৯ রান করে বিদায় নিলেও অধিনায়ক তামিম ছিলেন দৃঢ়। চাপের মুহূর্তে দায়িত্বশীল ও সাহসী ব্যাটিং করে তিনি ২টি চার ও ৩টি ছক্কায় ৪৭ বলে ৪৮ রান সংগ্রহ করেন।
শেষ দিকে ম্যাচের উত্তেজনা বাড়লেও বাংলাদেশের তরুণরা মাথা ঠান্ডা রেখে খেলেন। রিজান হোসেন ১৩ বলে ১৭ রান করে প্রয়োজনীয় গতি ধরে রাখেন এবং শেখ পারভেজ রহমান জীবন মাত্র ৭ বলে ১৩ রানের ক্যামিও ইনিংস খেলে জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ৪৮ ওভার ৫ বলেই ৭ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল।
এই জয় কেবল ম্যাচ জয়ের আনন্দ নয়, ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়। যুব এশিয়া কাপের ইতিহাসে এত বড় রান তাড়া করে এর আগে কোনো দল জিততে পারেনি। আগের রেকর্ডটি ছিল ভারতের, যারা ২০২১ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় পেয়েছিল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়। ২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩০৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ৬ উইকেটে জয়ের স্মৃতি এখনও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে তাজা।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ শিবিরে ছিল স্বস্তি ও উচ্ছ্বাসের আবহ। কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়দের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। বড় মঞ্চে এমন জয় দলকে মানসিকভাবে অনেক শক্ত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে টুর্নামেন্টের শুরুতেই এমন রেকর্ড গড়া জয় প্রতিপক্ষদের কাছেও স্পষ্ট বার্তা—শিরোপা ধরে রাখতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল প্রস্তুত।
দুবাইয়ের এই মাঠেই সোমবার নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচের আত্মবিশ্বাস সঙ্গে নিয়ে তারা সেই লড়াইয়েও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে চাইবে। তরুণদের এই সাহসী পারফরম্যান্স দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে, যা অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপজুড়ে বাংলাদেশকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করবে।