প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বরে ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আগামীকাল সোমবার সিঙ্গাপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিবার, চিকিৎসক ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় কয়েক দিন ধরে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা হাদির চিকিৎসায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রোববার সকালে হাদির পরিবার এবং তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা সুবিধা ও বিশেষায়িত নিউরো ক্রিটিক্যাল কেয়ারের জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি স্থানান্তরের উপযোগী কি না, সেই বিষয়টি নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করছেন চিকিৎসকরা। সর্বশেষ মূল্যায়নে বোর্ড জানিয়েছে, হাদি ‘প্রাথমিকভাবে ট্রান্সফারেবল কন্ডিশনে’ রয়েছেন, যদিও তার অবস্থা এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করেই হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে। এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে তাকে ভর্তি করার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ভিসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাদির সঙ্গে তার ভাই আবু বকর সিদ্দীক সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন এবং পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হবে।
হাদির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তার ফুসফুসের অবস্থা আগের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে এবং লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখা হয়েছে। কিডনির কার্যকারিতাও আপাতত স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে। তবে চিকিৎসকদের ভাষায়, মূল সংকট এখন মস্তিষ্ককে ঘিরে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তার মস্তিষ্কে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দিয়েছে, যা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। এই জটিলতার কারণেই বিদেশে নিয়ে গিয়ে আরও উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে নিউরো ক্রিটিক্যাল কেয়ার এবং ট্রমা ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক সুযোগ রয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে হাদির মস্তিষ্কের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, স্থানান্তর নিজেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাদির ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে তার শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় রিকশায় করে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তার মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটি মাথার ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি গুরুতর আহত হন এবং দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
হাদির এই অবস্থা দেশজুড়ে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ তার জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে এই হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও হাদির পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে হাদিকে বিদেশে পাঠাতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। সরকারের এই আশ্বাসের পরই পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয় এবং দ্রুততার সঙ্গে বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি এগিয়ে যায়। সরকারি সহায়তার বিষয়টি পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মহলে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হাদিকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু একটি চিকিৎসা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করে। সহিংস রাজনৈতিক ঘটনার শিকার একজন প্রার্থীকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা আন্তরিক, সেটিরও একটি পরীক্ষা এটি। একই সঙ্গে এই ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশে নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এনেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর পর হাদির ওপর বিস্তারিত নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা চালানো হবে। তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, অক্সিজেন স্বল্পতার মাত্রা এবং স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন বিশেষজ্ঞরা। প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি আইসিইউ সাপোর্ট ও পুনর্বাসন চিকিৎসাও লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই মুহূর্তে হাদির পরিবার সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বেগ আর প্রত্যাশার মধ্যে কাটাচ্ছে। একদিকে চিকিৎসার ঝুঁকি, অন্যদিকে উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এটি তাদের জন্য এক কঠিন সময়। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা দেশবাসীর কাছে হাদির জন্য দোয়া চেয়েছেন এবং একই সঙ্গে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
সবশেষ পরিস্থিতিতে বলা যায়, শরিফ ওসমান হাদির চিকিৎসা আগামীকাল সিঙ্গাপুরে নেওয়ার মাধ্যমে এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। তার শারীরিক অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক হলেও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে হয়তো নতুন আশার আলো দেখা দিতে পারে। দেশবাসী তাকিয়ে আছে সেই আশার দিকেই—একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা নিয়ে।