প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি নানা কৌশলের কারণে দেশের চালের বাজার কিছুদিন ধরে স্থিতিশীল থাকলেও করপোরেট সিন্ডিকেটের নজর এখনো কমেনি। গত কয়েকদিনে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে তিন থেকে চার টাকা কমলেও সরু চালের দাম দীর্ঘ তিন সপ্তাহ ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সরকারির কার্যকর আমদানি নীতি ও সংগ্রহ অভিযান সিন্ডিকেট চক্রকে অনেকটাই বিপাকে ফেলেছে, তবে তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির স্বল্পতা থাকায় যেকোনো সময় দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের চাঁদপুর রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়া জানান, আগের বছরগুলোতে করপোরেট কোম্পানিগুলো একসঙ্গে বিপুল পরিমাণে চাল আমদানির অনুমতি পেত। তারা অনুমোদনের বেশি চাল কিনে মজুত করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করত। তবে এবার সরকারের আমদানি নীতি, যেখানে স্বল্প পরিমাণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, সেই কারণে সিন্ডিকেট বাজারে দামের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। ফলে চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে এবং দাম কমেছে।
গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, গুটি, স্বর্ণা, পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ জাতের চালের সরবরাহ বাড়ায় কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা কমেছে। খুচরা বাজারে নাজিরশাইল, জিরাশাইলসহ সরু চালের দাম কেজিতে ৬৮ থেকে ৭৮ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। নতুন গুটি স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। অন্যদিকে মিনিকেট চাল ৭৪ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ের জনতা রাইস এজেন্সির মালিক হাজি আবু ওসমান জানান, ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ায় চালের দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। মোটা চাল ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে, মাঝারি চাল ৬৫ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে এবং সরু চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সিদ্ধ চালের দাম কমলেও পোলাও চালের দাম মানভেদে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। মোজাম্মেল কোম্পানির পোলাও চাল সর্বোচ্চ ১৪০ টাকায় এবং অন্যান্য কোম্পানির আতপ চাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক মূল্যতালিকা অনুযায়ী, মোটা চালের দাম সর্বনিম্ন ৫৪ টাকা ও সর্বোচ্চ ৬০ টাকা, মাঝারি জাতের চাল ৫৮ থেকে ৬৮ এবং সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে রয়েছে। তবে গত এক মাসে সরু চালের দাম কমেছে মাত্র ১ দশমিক ২৭ টাকা, মাঝারি চালের দাম কমেছে ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় এবং ভারতের বিকল্প উৎস থাকায় বাজার আগামী দিনেও স্থিতিশীল থাকবে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৬ লাখ মেট্রিক টন চাল মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ১২ লাখ মেট্রিক টন নিরাপদ মজুত হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০ নভেম্বর থেকে আমন সংগ্রহ শুরু হওয়ায় মজুত আরও বৃদ্ধি পাবে।
গত অর্থবছরে দেশে মোট ১৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে, যার মধ্যে সরকারিভাবে ৮ লাখ ৩৫ হাজার টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টন। সরকারিভাবে আমদানি হওয়া চালের মধ্যে ৬ লাখ টন এসেছে ভারত থেকে, ১ লাখ টন মিয়ানমার থেকে, ১ লাখ টন ভিয়েতনাম থেকে এবং বাকিগুলো পাকিস্তান থেকে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার নতুন করে ভারত থেকে আরও ৫০ হাজার টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানি করা হবে, প্রতি টনের দাম ৩০৮ ডলার।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের এই নীতি সিন্ডিকেট চক্রকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করছে। স্বল্প ও নিয়ন্ত্রিত আমদানির কারণে কোম্পানিগুলো বাজারে দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে না। তবে বেসরকারি আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে তারা যেকোনো সময় কৌশল পরিবর্তন করে দাম বাড়াতে পারে। তাই বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সংক্ষেপে, সরকারের সচেতন নীতি ও যথাযথ সংগ্রহ অভিযান চালু থাকার কারণে দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও করপোরেট সিন্ডিকেটের চোখ এখনো বাজারে। সরবরাহ বাড়ায় দাম সামান্য কমলেও সিন্ডিকেট যে কখনো দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে, তা এ বাজার পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট।