প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির শারীরিক অবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি বা অবনতি হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সংক্রমণের ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়।
হাদির চিকিৎসার সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ও ন্যাশনাল হেলথ এলায়েন্সের (এনএইচএ) সদস্যসচিব ডা. আব্দুল আহাদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, হাদির বর্তমান শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। বিশেষ করে সংক্রমণের ঝুঁকি এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেনের স্বল্পতা চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ডা. আব্দুল আহাদ জানান, ‘হাদির শারীরিক অবস্থা আগের মতোই রয়েছে। নতুন করে বড় কোনো অবনতি হয়নি, আবার দৃশ্যমান উন্নতিও হয়নি। ফুসফুসের সমস্যা আগের মতোই রয়েছে। তবে সংক্রমণের হার পুরোপুরি শূন্যে নামেনি। এ কারণেই মেডিকেল বোর্ড সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নয়। তবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। ইনফেকশন রেট প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার সক্ষমতার কারণেই সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাদির মস্তিষ্কের অবস্থা এখনো উদ্বেগজনক। মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছানোর কারণে তার স্নায়বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে চিকিৎসকরা পুরোপুরি হতাশ নন। ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের সময় আমরা হাদির মতো সংকটাপন্ন অনেক রোগীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে দেখেছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এখনো আশা আছে। আমরা বিশ্বাস করি, হাদিও আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।’
সোমবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে ওসমান হাদিকে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। দুপুর ১টা ৫১ মিনিটে অসপ্রে এভিয়েশনের একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স তাকে বহন করে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিশেষায়িত মেডিকেল টিম, যারা উড়োজাহাজেই তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন।
এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনি প্রচার শেষে ফেরার পথে রাজধানীর বিজয়নগরের কালভার্ট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুব কাছ থেকে ছোড়া গুলি তার মাথার ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন।
আহত হওয়ার পর দ্রুত তাকে উদ্ধার করে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হলেও তার অবস্থা সংকটাপন্ন থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য একই দিন রাত সাড়ে ৭টার দিকে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে টানা কয়েক দিন সেখানেই তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন এই হামলাকে ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তার সুস্থতার জন্য দেশজুড়ে দোয়া ও সমর্থনের ঢল নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাদির সুস্থতা কামনায় নানা প্রচারণা চালাচ্ছেন তার সমর্থকরা।
চিকিৎসকদের মতে, আগামী কয়েক দিন হাদির চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুরে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এনে তার মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের কার্যক্রম স্থিতিশীল করা। সেখানকার চিকিৎসা পদ্ধতির অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা এখনো আশাবাদী। পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‘ডাক্তাররা আমাদের বলেছেন, অবস্থা গুরুতর হলেও পুরোপুরি আশাহীন নয়। আমরা দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, যেন হাদি দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।’
ওসমান হাদির ওপর এই হামলা শুধু একটি ব্যক্তিগত আঘাত নয়, বরং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও সহিংসতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তার চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থার দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। এখন সবার একটাই প্রত্যাশা—উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে হাদি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।