নয়াদিল্লি বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত, আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৮ বার
নয়াদিল্লি বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি ক্রমেই ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবলে পড়েছে। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) সকালে দিল্লি ও এর আশপাশের এলাকা ঘন কুয়াশা ও ধোঁয়াশার চাদরে ঢেকে যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমানতা এতটাই কমে গেছে যে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না। স্থানীয় বায়ুমান সূচক অনুযায়ী, সকাল ৬টায় দিল্লির এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স ৪৫৬ রেকর্ড করা হয়েছে, যা ‘মারাত্মক’ পর্যায়ের হিসেবে গণ্য করা হয়।

ধোঁয়াশার কারণে দিল্লি বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, অন্তত ১০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং ৩০০টিরও বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ফ্লাইটের স্ট্যাটাস নিয়মিত যাচাই করতে এবং প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

শুধু আকাশপথ নয়, রেল যোগাযোগও এই বায়ুদূষণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কম দৃশ্যমানতার কারণে দিল্লি গামী এবং দিল্লি ত্যাগকারী প্রায় ৯০টির বেশি ট্রেন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি শহরের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

বায়ুমান নিয়ন্ত্রণে ভারতের গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের (GRAP) সর্বোচ্চ স্তর বা স্টেজ ফোর চালু করা হয়েছে। এর আওতায় দিল্লি এনসিআরে সব ধরনের নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে ৫০ শতাংশ কর্মী বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ পেয়েছেন। স্কুল ও কলেজগুলো একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত হাইব্রিড পদ্ধতিতে, অর্থাৎ অনলাইন ও অফলাইনের সংমিশ্রণে ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ভার্চুয়াল শুনানির নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, আইনজীবী ও মামলার পক্ষগুলো ভার্চুয়ালি অংশ নিতে পারেন যাতে স্বাভাবিক চলাচল ও নিরাপত্তা বজায় থাকে।

এদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিস্থিতির গুরুতরতা বিবেচনা করে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সিঙ্গাপুর তাদের নাগরিকদের জন্য ভারত ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে। সিঙ্গাপুর হাইকমিশন নাগরিকদের ফ্লাইট স্ট্যাটাস নিয়মিত নজরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার গর্ভবতী নারীদের পাশাপাশি হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য শ্বাসনালী সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ভারত ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নয়াদিল্লি ও এর আশেপাশের এলাকায় ক্রমবর্ধমান যানজট, শিল্প কারখানা ও গাড়ির নির্গমন এবং শীতকালীন কুয়াশা একত্রিত হয়ে শহরের বায়ুদূষণকে মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। শহরের বাতাসে ক্ষতিকারক ধূলিকণার পরিমাণ মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বায়ুদূষণ শ্বাসনালী সংক্রান্ত অসুস্থতা, চোখের জ্বালা, হাঁপানি ও দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সরাসরি প্রভাব পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। রাস্তায় চলাচল সংকুচিত হয়েছে, যানবাহন ধীরগতি সম্পন্ন হচ্ছে এবং স্কুল-কলেজের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকে ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বৃদ্ধি করতে পারে।

দূষণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দিল্লি ও আশেপাশের এলাকায় সারা সপ্তাহ জোরদার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিল্পকারখানা, বড় যানবাহন এবং নির্মাণকাজে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের মাস্ক ব্যবহার ও দূষণযুক্ত এলাকায় দীর্ঘসময় অবস্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সাধারণ মানুষ যেন স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে না পড়ে, সেজন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে শ্বাসনালী সংক্রান্ত রোগের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বায়ুদূষণের মাত্রা কমানোতে পরিবেশ সচেতনতা, যানবাহনের কম নির্গমন এবং পাবলিক পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকরা সতর্ক করেছেন, যদি এই অবস্থা অব্যাহত থাকে, তবে নয়াদিল্লি শহরের বাসিন্দাদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং পূর্বশর্তযুক্ত রোগে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক।

সার্বিকভাবে বলা যায়, নয়াদিল্লির বায়ুদূষণ ইতোমধ্যেই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিকভাবে সতর্কতা জারি হওয়ায় দেশভ্রমণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে। নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিচ্ছে, তবে সাধারণ মানুষকে নিজেরাও সচেতন হওয়া জরুরি।

নয়াদিল্লির বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শহরের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত