রাজনৈতিক পুরোনো ন্যারেটিভ প্রত্যাখ্যান করছে তরুণ সমাজ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
রাজনৈতিক পুরোনো ন্যারেটিভ প্রত্যাখ্যান করছে তরুণ সমাজ

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের রাজনীতি, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে। বিজয়ের মাসে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র এবং তরুণ সমাজের ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ঠিক এমন এক প্রেক্ষাপটে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অতীতের কিছু রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নতুন করে সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়। তবে তার মতে, বর্তমান তরুণ সমাজ সেই বিভাজনমূলক ন্যারেটিভ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা ভবিষ্যৎমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি বাংলাদেশ গড়ার চিন্তায় বেশি মনোযোগী।

মঙ্গলবার সকালে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা কলেজে আয়োজিত এক সাইকেল র‍্যালিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিজয়ের মাসের কর্মসূচি হিসেবে আয়োজিত এই র‍্যালিকে ঘিরে সকাল থেকেই কলেজ প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, জাতীয় পতাকা ও ব্যানার নিয়ে র‍্যালির মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা ছিল আয়োজকদের।

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম তার বক্তব্যে বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশ নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিছু সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ধারা দেশকে সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা হরণ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। তার ভাষায়, সেই সময়ের দুর্ভিক্ষ ও অস্থিরতার প্রভাব জাতির জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং দীর্ঘমেয়াদি।

তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের সেই অধ্যায়গুলোকে সামনে এনে আজও কিছু গোষ্ঠী তরুণদের বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম আগের মতো একপেশে বা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করে না। তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তরুণরা ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তাকে বহুমাত্রিকভাবে বিশ্লেষণ করছে। ফলে বিভাজনমূলক বক্তব্য বা পুরোনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ দিয়ে তাদের সহজে প্রভাবিত করা যাচ্ছে না।

শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল তার বক্তব্যে নতুন বাংলাদেশের ধারণা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুর্নীতিমুক্ত, দেশপ্রেমিক ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য তারা কাজ করতে চান। তার মতে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিধার কথা বলা হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখতে হবে।

এই বক্তব্যকে ঘিরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ এটিকে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বিজয়ের মাসে এ ধরনের আলোচনা ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। অনেক শিক্ষার্থী বলেন, তারা রাজনীতিকে শুধু অতীতের দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের জায়গা হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখতে চান।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা কলেজ শাখার আয়োজনে সকাল পৌনে ৮টায় ঢাকা কলেজের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণ থেকে সাইকেল র‍্যালিটি শুরু হয়। শহীদ মিনার থেকে যাত্রা শুরু করে র‍্যালিটি সংসদ ভবন এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। এই পথচলায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ধীর হয়ে পড়লেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।

র‍্যালিতে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের অনেকের হাতেই ছিল জাতীয় পতাকা, কেউ কেউ বিজয়ের মাস ও স্বাধীনতা বিষয়ক স্লোগান লেখা ব্যানার বহন করেন। সাইকেল র‍্যালির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের বার্তাও দেওয়ার চেষ্টা ছিল আয়োজকদের। একই সঙ্গে এটি ছিল তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি প্রতীকী প্রদর্শন।

অনুষ্ঠানে ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা কলেজ শাখার সভাপতি মোস্তাকিম আহমেদের সভাপতিত্বে এবং আব্দুর রহমান আফনানের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র অধিকার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম। তাদের বক্তব্যেও স্বাধীনতার চেতনা, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং তরুণ সমাজের ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

বিশেষ অতিথিরা বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়, বরং সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব তরুণদের। তারা মনে করেন, শিক্ষাঙ্গন থেকেই সচেতন, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে। এজন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ সমাজকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে নতুন চিন্তাধারার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। তারা উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও মানবিক মর্যাদার মতো বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করে দেওয়া যে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যই এখন নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।

বিজয়ের মাসে আয়োজিত এই সাইকেল র‍্যালি ও বক্তব্য তাই শুধু একটি সংগঠনের কর্মসূচি হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তরুণ সমাজের চিন্তাভাবনা, প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়ায় তরুণদের ভূমিকা যে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, এই আয়োজন তারই একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকেই।

সব মিলিয়ে, পুরোনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ প্রত্যাখ্যান করে তরুণ সমাজ যে ভবিষ্যৎমুখী চিন্তায় এগোতে চায়, সেই বার্তাই বিজয়ের মাসে ঢাকা কলেজের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিন্তাধারা কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত