প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিয়ে মানেই শুধু দুটি জীবনের মিলন নয়, এটি প্রজন্মের স্মৃতি ও সামাজিক আবহের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর বিয়ের প্রথাগত আয়োজনের অন্যতম অঙ্গ হলো স্বর্ণের গহনা। আমাদের সমাজে স্বর্ণ শুধুমাত্র অলংকার হিসেবে নয়, এটি পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক মর্যাদা এবং কখনও কখনও একটি নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তবে অনেক সময় আবেগ, সামাজিক চাপ এবং বিজ্ঞানের অপরিচিততার কারণে মানুষ সঠিকভাবে সোনা কেনার বিষয়ে সচেতন থাকেন না, যা পরে নানা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিয়ের মৌসুমে সোনা কেনার আগে কিছু বিষয় খুঁটিয়ে জানা অত্যন্ত জরুরি।
স্বর্ণ কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর মান বা বিশুদ্ধতা। বাংলাদেশে সাধারণত ২৪, ২২ ও ২১ ক্যারেট স্বর্ণের গহনা বেশি প্রচলিত। ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ সর্বাধিক বিশুদ্ধ হলেও এটি খুব নরম হওয়ায় গহনায় কম ব্যবহৃত হয়। আর ২২ ক্যারেট স্বর্ণ হলো বিয়ের গহনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয়। কেনার সময় অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে, গহনায় স্পষ্টভাবে ক্যারেটের ছাপ বা হলমার্ক আছে কি না। হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ মানে গহনার মান নিশ্চিত, যা ভবিষ্যতে বিক্রি, বদল বা পুনঃমূল্যায়নে বিশেষ সহায়ক হয়।
গহনার সঙ্গে অনেক সময় মানের সনদ বা সাটিফিকেট দেওয়া হয়। এই সনদগুলি সংরক্ষণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো ছাড়া বিক্রি বা অন্যত্র মূল্যায়ন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে গহনা বদলাতে চান বা বিক্রি করতে চান, তখন সনদ না থাকলে দোকানদার বা ক্রেতা অতিরিক্ত কাটা বা কম মূল্য দিতে পারে। তাই কেনার সময় এই সনদগুলি সবসময় হাতে রাখতে হবে।
স্বর্ণ কেনার সময় অনেকেই শুধুমাত্র মোট দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু মূল বিষয় হলো সোনার বর্তমান বাজার মূল্য এবং নকশা বা মজুরির খরচ। গহনার নকশা যত জটিল হবে, মজুরি তত বেশি হবে। তাই কেনার আগে স্পষ্টভাবে জানতে হবে প্রতি ভরির স্বর্ণের দাম, নকশার মজুরি কত এবং সব মিলিয়ে মোট খরচ কত। এটি শুধু সঠিক বাজেট তৈরি করতে সাহায্য করবে না, ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সমস্যাও এড়িয়ে যাবে।
গহনার ওজন যাচাই করা অপরিহার্য। দোকানে ডিজিটাল ওজন মেশিনে গহনা পরিমাপ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা উচিত। প্রয়োজনে নিজেও ওজন পরীক্ষা করতে পারেন। অনেক সময় বিক্রেতা ওজনের সঙ্গে পাথর বা অতিরিক্ত অংশের ওজন স্বর্ণের সঙ্গে মেলিয়ে দেখায়, যা ক্রেতার জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাই ওজন নিশ্চিত করা এবং কেবল সোনার ওজন নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ের পরিবর্তিত রুচি অনুযায়ী, বিয়ের গহনা মানেই ভারি ও জাঁকজমকপূর্ণ হতে হবে—এ ধারণা ক্রমশ বদলাচ্ছে। অনেক দম্পতি এখন হালকা, ব্যবহারযোগ্য এবং নান্দনিক নকশার গহনা পছন্দ করছেন। হালকা গহনা শুধু পরতে সহজ নয়, এটি দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী এবং পরে বিক্রির ক্ষেত্রেও সুবিধাজনক। এতে মজুরি কম লাগে এবং গহনাও দীর্ঘ সময় ধরে ভালো থাকে।
স্বর্ণ কেনার সময় দোকানের বদল বা বিক্রির নিয়ম জানা খুব জরুরি। ভবিষ্যতে যদি গহনা বদলাতে চান, কত শতাংশ কাটা যাবে, মজুরি ফেরত পাওয়া যাবে কি না—এসব বিষয়ে আগেভাগে পরিষ্কার তথ্য রাখা প্রয়োজন। এতে পরে ঝামেলা এড়ানো যায়। অনেক সময় মানুষ শুধুমাত্র দোকান থেকে কেনার সময় সঙ্কেত পেয়ে পরে সমস্যায় পড়ে, যা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কেনার পর অবশ্যই রসিদ ও সনদ সংরক্ষণ করতে হবে। এগুলি ছাড়া ভবিষ্যতে গহনা বিক্রি বা যাচাই করা কঠিন হয়ে যায়। ছোট মনে হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই যে কোনো ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে এই কাগজপত্র নিরাপদে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে, বিয়ের মৌসুমে স্বর্ণ কেনা যত আনন্দের, তার চেয়েও বেশি দায়িত্বের বিষয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখলেই গহনা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ বিনিয়োগও হয়ে ওঠে। তাই সোনার গহনা কেনার আগে সতর্কতা, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক। বিয়ের আনন্দকে আরও স্মরণীয় করতে, গহনা কেনার ক্ষেত্রে এই নান্দিক দিকগুলো খেয়াল রাখলেই পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সঠিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব।
এইভাবে সচেতন এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিলে, বিয়ের জন্য কেনা স্বর্ণ শুধুমাত্র শোভা বৃদ্ধি করবে না, দেশের বাজারে সঠিক মূল্যও নিশ্চিত হবে। সামাজিক প্রথা, আবেগ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—এই তিনটির মধ্যে সুষম ভারসাম্য রাখাই বিয়ের গহনা কেনার মূল চাবিকাঠি।