হাদিকে হত্যাচেষ্টায় পলাতকদের ‘সহযোগী’ ফিলিপ স্নাল কে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
ফিলিপ স্নাল

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির ওপর সংঘটিত হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ফিলিপ স্নাল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, হামলার পর অভিযুক্ত ফয়সাল ও আলমগীরকে পালাতে সহায়তা করেছেন এই ফিলিপ স্নাল। ঘটনার পাঁচ দিন পার হলেও হামলাকারীদের কোনো হদিস না মেলায়, ফিলিপকে গ্রেপ্তার করতে না পারাই তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ফিলিপ স্নাল হালুয়াঘাট উপজেলার গাজীরভিটা ইউনিয়নের ভুটিয়াপাড়া এলাকায় বাবার বাড়িতে বসবাস করতেন। পাশাপাশি তার শ্বশুরবাড়ি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার বারমারি এলাকায়। সীমান্তঘেঁষা এই এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান, মানবপাচার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চল দিয়ে সীমান্ত পার হওয়া তুলনামূলক সহজ এবং নজরদারি এড়িয়ে যাতায়াতের সুযোগও বেশি।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) রাতে ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির ওপর হামলার মাধ্যমে। হামলার পরপরই অভিযুক্ত ফয়সাল ও আলমগীর আত্মগোপনে চলে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ঘটনার রাতেই তারা রাজধানী ছেড়ে ময়মনসিংহের দিকে রওনা হয়। বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, তারা প্রথমে একটি প্রাইভেটকারে মিরপুর থেকে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে গাড়ি বদল করে হালুয়াঘাট উপজেলার ধারা বাজারসংলগ্ন একটি ফিলিং স্টেশনের কাছে নামেন।

সেই নির্জন স্থান থেকেই ফিলিপ স্নালের মোটরসাইকেলে করে তাদের ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত এলাকায় নেওয়া হয় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা। ফিলিং স্টেশন এলাকার আশপাশে পর্যাপ্ত সিসিটিভি না থাকায় অভিযুক্তদের গতিবিধি ফুটেজে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, পরিকল্পিতভাবেই এমন একটি জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছিল, যাতে শনাক্তের ঝুঁকি কম থাকে।

ময়মনসিংহ বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ফিলিপ স্নালের সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতে ভুটিয়াপাড়া এলাকা থেকে তার দুই সহযোগীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। আটক ব্যক্তিরা হলেন ভুটিয়াপাড়া এলাকার ক্লেমেন রিছিলের ছেলে সঞ্জয় চিসিম (২৫) এবং বিড়ইডাকুনী এলাকার চার্লস রিছিলের ছেলে সিবিরণ দিও (৩৫)। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে বিজিবি ও পুলিশ।

বিজিবি সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের বহনে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ভুটিয়াপাড়া এলাকা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। এটি ফিলিপ স্নালের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই মোটরসাইকেল উদ্ধার ফিলিপের বিরুদ্ধে অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। তবে মূল অভিযুক্ত ফিলিপ স্নাল এখনও পলাতক থাকায়, ফয়সাল ও আলমগীর সত্যিই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়েছে নাকি দেশের ভেতরেই আত্মগোপনে আছে—তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

ভুটিয়াপাড়া এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে জানা যায়, এটি ভারত সীমান্তের একেবারে নিকটবর্তী একটি দুর্গম অঞ্চল। ফিলিপ স্নালের বাড়ি থেকে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া প্রায় ২০০ গজ দূরে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কাঁটাতারের নিচে বেশ কয়েকটি কালভার্ট ও পুরনো সুরঙ্গ রয়েছে, যেগুলো দিয়ে সহজেই সীমান্ত পার হওয়া সম্ভব। এসব পথ দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফিলিপ স্নাল প্রায়ই ভারত যাতায়াত করতেন। তার এই যাতায়াত নিয়ে এলাকায় আগে থেকেই নানা আলোচনা ছিল। ৫ আগস্টের পর এই পথ দিয়েই আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী ভারতে পালিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফিলিপ স্নালের নাম উঠে আসায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে ফিলিপের পরিবার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছে। তার ছোট বোন সালচি স্নাল বলেন, তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে তাদের পরিবারের দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং সেই বিরোধ থেকেই পুলিশকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন ফিলিপ স্নাল শুধু মাকে দেখতে বাড়িতে এসেছিলেন এবং বিকেলেই চলে যান।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আটক সঞ্জয় চিসিম কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ তাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে দাবি করে বলেন, যদি তিনি অপরাধে যুক্ত থাকতেন, তাহলে বাড়িতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন না। পরিবারের এই বক্তব্য তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নয়।

এ বিষয়ে কর্নেল সরকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ফিলিপ স্নালকে আটক করতে পারলেই পুরো ঘটনার চিত্র পরিষ্কার হবে। কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ হয়েছে, কত টাকা লেনদেন হয়েছে, ওপারে কারা জড়িত—সবকিছুই তার জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আরও জানান, মানবপাচার ও সহিংস অপরাধে জড়িতদের ধরতে সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই হত্যাচেষ্টার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এর পেছনে সংগঠিত একটি নেটওয়ার্ক কাজ করছে। সেই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারেন ফিলিপ স্নাল। তাই তাকে গ্রেপ্তার করা না গেলে তদন্তের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ওসমান হাদির ওপর হামলার পর পলাতক অভিযুক্তদের খোঁজ এবং ফিলিপ স্নালের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সীমান্ত এলাকার বাস্তবতা, স্থানীয় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং উদ্ধার হওয়া আলামত—সবকিছু মিলিয়ে এই মামলার পরিণতি অনেকটাই নির্ভর করছে ফিলিপ স্নালকে গ্রেপ্তার করার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত