দিল্লির নসিহত মানছে না ঢাকা, টানাপোড়েনে সম্পর্ক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
দিল্লির নসিহত মানছে না ঢাকা, টানাপোড়েনে সম্পর্ক

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে এক জটিল ও উত্তপ্ত পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক তলব-পাল্টা তলব, রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা অভিযোগ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং নির্বাচনকে ঘিরে মতভেদের কারণে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে টানাপোড়েন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, দিল্লির কোনো ‘নসিহত’ শোনার প্রশ্নই ওঠে না। ঢাকার অবস্থান অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একান্তই বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের।

এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। বুধবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশকে উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা ঢাকা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। তার ভাষায়, বাংলাদেশ কী করবে এবং কীভাবে করবে, তা দেশ নিজেই ভালোভাবে জানে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত পনেরো বছরে যখন নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দেশে গুরুতর বিতর্ক ছিল, তখন দিল্লি কেন নীরব ছিল।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে আসে দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাইলেও বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। উভয় দেশের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই দূরত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। তার মতে, নির্বাচন নিয়ে উপদেশ দেওয়ার সময় নয় এটি, বরং একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময়।

এই বক্তব্যের পেছনের প্রেক্ষাপট বেশ জটিল। সম্প্রতি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখান থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর এই উদ্বেগ আরও গভীর হয়। ঢাকার মতে, এসব বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল।

বাংলাদেশের এই তলবের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নয়াদিল্লি বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশে ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানাতেই এই তলব। বিশেষ করে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে নিরাপত্তা বিঘ্নের সম্ভাব্য ঘোষণাকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে উল্লেখ করে। এ ঘটনাকে কূটনৈতিক অঙ্গনে অস্বাভাবিক বলা না হলেও, বর্তমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, একে অপরের দূত তলব করা কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়। উভয় পক্ষের মতবিরোধ থাকতেই পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হবে, তা নিয়ে কোনো প্রতিবেশীর উপদেশ গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই একটি উচ্চমানের, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কথা বলে আসছে, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে।

ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন বার্তা এসেছে। নয়াদিল্লির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে ভারতের অবস্থান। তারা আশা প্রকাশ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। এই বক্তব্যকে ঢাকার পক্ষ থেকে সরাসরি নসিহত হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও জোটও নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করেছে, কিন্তু ভারতের বক্তব্যের সঙ্গে সেগুলোর পার্থক্য আছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ আছে, কারণ বাংলাদেশ চায় তারা পর্যবেক্ষক পাঠাক। ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন, কারণ অতীতে তারা বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতেও নীরব ছিল।

এই উত্তেজনার মধ্যে নিরাপত্তা ইস্যুও সামনে এসেছে। ঢাকায় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশন ও পোস্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতার অংশ এবং তারা এ বিষয়ে ঢাকার কাছ থেকে আশ্বাস প্রত্যাশা করে।

বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে যে কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ থাকতেই পারে, কিন্তু সেটিকে অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরাও সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়।

রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন, এটি সরকারের বক্তব্য নয়। সরকারের অবস্থান সবসময় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।

দুই দেশের সম্পর্কে অতীতের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত বছরের জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। বাংলাদেশ একাধিকবার তার প্রত্যর্পণ চাইলেও ভারত এখনো সে বিষয়ে সাড়া দেয়নি। ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থান করেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের উচিত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশে দাঁড়ানো। একই সঙ্গে তারা প্রত্যাশা করছে, বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ভারত স্পষ্ট অবস্থান নেবে।

সব মিলিয়ে দিল্লির নসিহত ঘিরে ঢাকার এই কঠোর অবস্থান শুধু একটি কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্নে একটি স্পষ্ট বার্তা। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে পারস্পরিক সংযম, কূটনৈতিক সংলাপ এবং বাস্তবতার স্বীকৃতির ওপর। তবে আপাতত স্পষ্ট, বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কোনো বাইরের উপদেশ গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়, আর এই অবস্থানই বর্তমান টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত