প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় একটি ছাত্রী হোস্টেল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের খবরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই এলাকায় শোক ও উৎকণ্ঠার আবহ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানায়, জিগাতলা পুরাতন কাচাবাজার রোডের একটি হোস্টেলের পঞ্চম তলার একটি কক্ষ থেকে জান্নাতারা রুমী নামে ৩০ বছর বয়সী ওই তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর হোস্টেলের বাসিন্দা, প্রতিবেশী এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে হোস্টেলের অন্যান্য বাসিন্দারা কক্ষের ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে দরজা খুলে ভেতরে মরদেহটি দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল সুরক্ষিত করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি সন্দেহজনক মৃত্যুর হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
জান্নাতারা রুমী নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার নাজিরপুর থানাধীন বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন ও নুরজাহান বেগমের মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ঢাকায় রওনা হন। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রুমী উচ্চশিক্ষা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুবাদে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং ওই ছাত্রী হোস্টেলেই থাকতেন। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা না হলেও তারা ন্যায়বিচার ও সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, জান্নাতারা রুমী জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে দলটির কোনো আনুষ্ঠানিক পদে তিনি ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এনসিপির একাধিক নেতা বলেন, রুমী বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তার মৃত্যুতে দলটির ভেতরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার পর হোস্টেল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, হোস্টেলের রেজিস্টার ও কক্ষের আশপাশের আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ধরনের পূর্বানুমান না করে সব সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যায়।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ তরুণীদের নিরাপত্তা ও আবাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছেন। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুজব বা অসমর্থিত তথ্য প্রচার না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দারা জানান, হোস্টেলটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলেই পরিচিত ছিল। এমন একটি ঘটনায় তারা বিস্মিত ও মর্মাহত। স্থানীয় একজন দোকানি বলেন, সকাল থেকে লোকজন ভিড় করছে, সবাই দুঃখিত এবং উদ্বিগ্ন। এমন ঘটনা কারও সাথেই কাম্য নয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এনসিপির কয়েকজন নেতা বলেন, রুমীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি তরুণ রাজনীতিকদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তারা নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানান এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, শহরের আবাসিক হোস্টেলগুলোতে বসবাসরত তরুণ-তরুণীদের মানসিক চাপ, নিরাপত্তা ও সহায়তা ব্যবস্থার বিষয়গুলো নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তারা বলছেন, কোনো মৃত্যুর ঘটনা সামনে এলে কেবল আইনগত তদন্ত নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটিও গুরুত্ব পায়। সহমর্মিতা, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রয়োজন অনুযায়ী গণমাধ্যমকে জানানো হবে। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ এলে তা নথিভুক্ত করা হবে বলে জানানো হয়।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও একটি তরুণ জীবনের আকস্মিক পরিসমাপ্তি সমাজকে নাড়া দিয়েছে। জান্নাতারা রুমীর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও পথচলার গল্পগুলো আজ থমকে গেলেও তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সত্য উদঘাটনই এখন সবার প্রত্যাশা। প্রশাসন বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। আর সমাজের পক্ষ থেকে শোকের এই সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে জরুরি।
সবশেষে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজ একযোগে আহ্বান জানিয়েছে—এ ধরনের ঘটনায় সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে, গুজব এড়িয়ে চলতে এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে। একটি তরুণ জীবনের মৃত্যু শুধু একটি খবর নয়, এটি আমাদের সবার জন্যই গভীর ভাবনার বিষয় হয়ে থাকল।