প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সম্মুখভাগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। সিঙ্গাপুর থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তার মস্তিষ্কে জটিল একটি অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, ব্রেনস্টেমের একটি সংবেদনশীল অংশে আটকে থাকা গুলির অংশ অপসারণের বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে হাদির পরিবার সিঙ্গাপুরেই অস্ত্রোপচারের অনুমতি দিয়েছে।
হাদির চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে তার পরিবার, সহকর্মী এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের মধ্যে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে তার পাশে রয়েছেন দুই ভাই, যারা শুরু থেকেই চিকিৎসা প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। পরিবারের আরেক সদস্যও জরুরি ভিত্তিতে সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং সম্ভাব্য সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।

ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শরিফ ওসমান হাদি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী নন, তিনি সাম্প্রতিক সময়ের গণআন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি যেভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা তাকে অনেকের কাছে সাহস ও প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে পরিচিত করেছে। আন্দোলনের সময় আহত হওয়ার পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থা ছিল জটিল, তবে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সর্বশেষ অবস্থায় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার জীবন রক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অস্ত্রোপচার বিবেচনায় নেওয়া ছাড়া বিকল্প খুব সীমিত।
বৃহস্পতিবার ইনকিলাব মঞ্চ এক বিবৃতিতে হাদির দ্রুত আরোগ্যের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, এই সংকটময় সময়ে তারা মানবিক সংহতি ও শান্তিপূর্ণ সমর্থন প্রত্যাশা করছে। হাদির সুস্থতা কামনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য মানুষ দোয়া ও শুভকামনার বার্তা দিচ্ছেন। অনেকেই তাকে একজন সাহসী তরুণ হিসেবে উল্লেখ করে তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের বিবৃতিতে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়েও অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। তারা বলেছে, হাদির ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে তারা অনড় থাকবে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানালেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
হাদির চিকিৎসা পরিস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে এবং সেই নেতৃত্বের ওপর এ ধরনের সহিংস ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। তারা মনে করছেন, মতপ্রকাশ ও আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতার পথ পরিহার করা জরুরি, যাতে কোনো প্রাণ ঝুঁকির মুখে না পড়ে।
সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি থাকলেও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে। হাদির শারীরিক অবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অপারেশনের ফলাফল নির্ভর করবে তার শরীরের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী পর্যবেক্ষণের ওপর। এই কারণে পরিবার ও সহকর্মীরা সবাই উদ্বিগ্ন হলেও আশাবাদী থাকার চেষ্টা করছেন।
দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনও হাদির সুস্থতা কামনায় একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, মতাদর্শ বা রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও একজন মানুষের জীবন ও সুস্থতা সবার ঊর্ধ্বে। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তারা হাদির চিকিৎসা সফল হোক—এই কামনা করছেন।

ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা জানিয়েছেন, হাদির চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে তারা যেকোনো ধরনের উত্তেজনা এড়িয়ে চলতে চান। তবে একই সঙ্গে তারা দাবি করছেন, সহিংস ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন, মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। হাদির মতো একজন তরুণের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়া সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, শরিফ ওসমান হাদির বর্তমান অবস্থা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং একটি প্রজন্মের উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুরে চলমান চিকিৎসা ও সম্ভাব্য অস্ত্রোপচারের দিকে তাকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। তার সুস্থতা কামনায় দেশজুড়ে যে দোয়া ও মানবিক সংহতি প্রকাশ পাচ্ছে, তা আবারও প্রমাণ করছে—সংকটের মুহূর্তে মানবিকতা ও সহমর্মিতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।