হিটারের গরম পানিতে ঝলসে প্রাণ গেল সাত মাসের শিশুর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৯ বার

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

হিটারের গরম পানিতে ঝলসে শিশুর মৃত্যু—এই মর্মান্তিক ঘটনাটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় আবারও ঘরোয়া অসাবধানতার ভয়াবহ পরিণতি সামনে নিয়ে এসেছে। মাত্র সাত মাস বয়সী আমিনুল ইসলাম, যে এখনো হাঁটতে শেখেনি, মায়ের চোখের আড়ালে এক মুহূর্তের অসচেতনতায় এমন এক দুর্ঘটনার শিকার হয়, যার পরিণতি মেনে নেওয়া কোনো বাবা-মায়ের পক্ষেই সহজ নয়। পরিবার, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় এলাকাবাসী—সবার চোখেই এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, সামান্য সতর্কতা কি এই ছোট্ট প্রাণটিকে বাঁচাতে পারত না?

নিহত আমিনুল ইসলাম চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গাউসিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াসের ছেলে। পরিবার জানায়, গত শুক্রবার বিকেলে আমিনুলের মা ঘরের কাজের প্রয়োজনে বৈদ্যুতিক হিটারে পানি গরম করছিলেন। শীতের মৌসুমে গরম পানির প্রয়োজনীয়তা প্রায় প্রতিটি ঘরেই থাকে, বিশেষ করে শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য কাজে। কিন্তু সেই নিত্যদিনের কাজই যে এমন ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক হিটারে রাখা গরম পানির পাত্রটি মেঝের কাছাকাছি ছিল। সেই সময় শিশুটি ঘরের ভেতর হামাগুড়ি দিচ্ছিল। এক মুহূর্তের জন্য মায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে গেলে অসাবধানতাবশত আমিনুল ওই গরম পানির মধ্যে পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ তার চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসেন এবং দ্রুত তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু ততক্ষণে শিশুটির শরীরের বড় একটি অংশ ভয়াবহভাবে ঝলসে গেছে।

ঘটনার পরপরই আমিনুলকে দ্রুত চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান। শিশুটির শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে তাকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। কয়েক দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটার দিকে শিশুটির মৃত্যু হয়।

নিহত শিশুর বাবা মোহাম্মদ ইলিয়াসের কণ্ঠে তখন ছিল অসীম বেদনা আর অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, ‘অসাবধানতায় হিটারের গরম পানিতে আমার ছেলে ঝলসে যায়। এতে তার শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ পুড়ে যায়। সব চেষ্টা করেও ছেলেকে বাঁচাতে পারিনি।’ এই কয়েকটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে একটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একটি মায়ের আজীবনের অপরাধবোধ আর একটি বাবার নিঃশেষ হয়ে যাওয়া শক্তি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শিশুদের ক্ষেত্রে দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি মারাত্মক। শরীরের ত্বক নরম হওয়ায় অল্প সময়ের গরম পানিতেও গভীর ক্ষত তৈরি হয়। চিকিৎসকেরা জানান, আমিনুলের মতো এত অল্প বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও দীর্ঘ সময়ের নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হলেও অনেক সময় তা সত্ত্বেও জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় না।

এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শীতকাল এলেই দেশের অসংখ্য ঘরে বৈদ্যুতিক হিটার, গরম পানির পাত্র ও বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যায়। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকায় এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ তারা বিপদের ধারণা বুঝতে পারে না এবং হামাগুড়ি বা হেঁটে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আমিনুল ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার হাসি-খেলায় মুখর ছিল পুরো ঘর। এখন সেই ঘর যেন নিঃশব্দ শূন্যতায় ভরে গেছে। প্রতিবেশীরা শিশুটির মৃত্যুর খবরে শোকাহত। অনেকেই বলছেন, এই দুর্ঘটনা তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। ঘরে ছোট শিশু থাকলে গরম পানি, বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা আগুনের উৎস কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরোয়া দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর বড় একটি কারণ হলো অসচেতনতা। বৈদ্যুতিক হিটার, কেটলি বা চুলায় গরম করা পানি শিশুদের নাগালের মধ্যে রাখা উচিত নয়। বিশেষ করে মেঝেতে বা নিচু স্থানে গরম পানির পাত্র রাখলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া ঘরের কাজের সময় শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে প্রতি বছরই দগ্ধ হয়ে শিশু আহত ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব দুর্ঘটনা ঘটে রান্নাঘর বা ঘরের ভেতরে রাখা গরম তরল পদার্থের কারণে। চিকিৎসকদের মতে, এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। একটু সতর্কতা, পরিকল্পনা ও সচেতনতা থাকলে অনেক শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

আমিনুল ইসলামের মৃত্যু তাই কেবল একটি খবর নয়, এটি একটি কঠিন বাস্তবতা ও সতর্কবার্তা। একটি মুহূর্তের অসাবধানতা যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু শোক প্রকাশ করা নয়, বরং এমন দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া।

আজ আমিনুল নেই, কিন্তু তার এই অকাল বিদায় যদি অন্য কোনো শিশুর জীবন রক্ষার সচেতনতা তৈরি করতে পারে, তবে সেটিই হতে পারে এই শোকের মাঝেও একমাত্র অর্থপূর্ণ শিক্ষা।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত