প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের শহরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে, আর এ তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার মেগাসিটিগুলো বিশেষভাবে নজরকাড়া অবস্থানে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও এখন ফের শহরের বায়ুমানের মান আবারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার বায়ুমানের একিউআই স্কোর ছিল ২৩৬, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এসময় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে ভারতের কলকাতা, যেখানে একিউআই স্কোর ২৪৭। এরপর ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে, তৃতীয় স্থানে রয়েছে মিশরের রাজধানী কায়রো ১৯৭ স্কোর নিয়ে। ভারতের রাজধানী দিল্লি রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে, যার স্কোর ১৯০। ইরানের রাজধানী তেহেরান পঞ্চম স্থানে আছে, স্কোর ১৮১। এই সূচক থেকে বোঝা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে বায়ুদূষণের প্রভাব বিশেষভাবে বাড়ছে, যা জনগণের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর।
একিউআই স্কোর শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত ভালো হিসেবে গণ্য হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর মাঝারি মানের বায়ু বোঝায়, আর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর ‘অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। ১৫১ থেকে ২০০ স্কোরের মধ্যে বায়ুকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। এই ধরণের অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থদের বাড়ির ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, আর সাধারণ মানুষেরও বাইরে কার্যক্রম সীমিত করা উচিত। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরের মধ্যে থাকা বায়ুকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচনা করা হয়। ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোরের মধ্যে বায়ু ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা নগরের বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
ঢাকায় এই সময়ে বায়ুদূষণের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প কলকারখানা, নির্মাণ কর্মকাণ্ড, ধূলা কণা ও আবর্জনার দহনকে উল্লেখ করেছেন। শীতকালে ঘন কুয়াশা এবং বাতাসের নিম্নগতি দূষণকে শহরের নীচে আটকে রাখে, ফলে ক্ষতিকর কণাগুলো বাতাসে ছড়িয়ে দীর্ঘ সময় মানুষের শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে। রাজধানীর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, শহরের মানুষ বিশেষভাবে শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালা, গলা ব্যথা ও দীর্ঘমেয়াদী ফুসফুসজনিত সমস্যা অনুভব করছেন।
সাধারণ মানুষও এই দূষণের প্রভাবে দিনমজুর, স্কুলছাত্র, শিশু এবং বৃদ্ধরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই ধরণের বায়ুদূষণ যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে ঢাকার জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই বেড়ে যাবে। স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকরা এখন মাস্ক ব্যবহার এবং বাইরে কম যাওয়া, ঘরের জানালা ও দরজা বন্ধ রাখা, ভেজা কাপড় ঝুলানো থেকে দূষিত কণা কমানো এবং উদ্ভিদরোপণের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন।
ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শহরের তুলনাও এই সংকটকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। কলকাতা, দিল্লি ও তেহেরানসহ একাধিক শহরে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তরফে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও কার্যকর ফলাফল এখনও সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জনসংখ্যার সচেতনতা ছাড়া এই সংকট প্রতিদিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
আইকিউএয়ারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই বায়ুমানের অবস্থার সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বিশেষ করে শীতকালে স্থির কুয়াশা, বাতাসের কম গতিবেগ এবং তাপমাত্রার নিম্নগতি যুক্ত হয়ে দূষণকে শহরের ওপর স্থির রাখে। তাই ঘন কুয়াশা সহ শীতকালে ঢাকা ও এ অঞ্চলের মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বায়ুদূষণ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে না, বরং অর্থনীতি ও সাধারণ জীবনধারাকেও প্রভাবিত করছে। দূষণের কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি কমছে এবং হাসপাতাল ভর্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের প্রশাসন ও জনগণকে এখন মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে, যেমন যানবাহনের ধোঁয়া কমানো, শিল্পকলার নিয়ন্ত্রণ, সড়ক পরিচ্ছন্নতা এবং গাছপালা বৃদ্ধি করা।
ঢাকার বাতাসের ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থার কারণে শিশু, প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অসুস্থরা বিশেষভাবে ঘরের ভেতর থাকায় এবং বাইরে খুব কম সময় কাটাতে পরামর্শপ্রাপ্ত। সাধারণ মানুষও দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে ফেস মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।