প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান সময়ে নারীদের মধ্যে হাঁটুব্যথা ও হাড়ের ব্যথা একটি নীরব কিন্তু ব্যাপক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে ৪৫ বছরের পর এমন নারী খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি হাঁটু বা পায়ের ব্যথায় ভোগেন না। অনেকের ক্ষেত্রে ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে দৈনন্দিন কাজকর্ম, হাঁটা কিংবা সিঁড়ি ভাঙাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ নারীদের হাড়ের ক্ষয় বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা নারীদের জীবনে এক ধরনের স্থায়ী উদ্বেগ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. কিরণ মুখোপাধ্যায় জানান, নারীদের শরীরে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার প্রক্রিয়া পুরুষদের তুলনায় অনেক আগেই শুরু হয়। সাধারণত নারীদের ক্ষেত্রে ৪০ বছরের পর থেকেই হাড় ক্ষয়ের প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি শুরু হয় প্রায় ৭০ বছর বয়সের পর। এই ব্যবধানের অন্যতম প্রধান কারণ হরমোনজনিত পরিবর্তন। বিশেষ করে মেনোপজের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। ইস্ট্রোজেন হাড়কে সুরক্ষা দেয়, তাই এই হরমোন কমে গেলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে।
চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শুধু হাড় নয়, পেশিশক্তিও কমতে থাকে। পেশি দুর্বল হলে শরীরের ওজন বহনের চাপ সরাসরি হাড় ও জয়েন্টের ওপর পড়ে। হাঁটুর ক্ষেত্রে এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে, কারণ হাঁটু শরীরের প্রায় পুরো ওজন বহন করে। ফলে হাঁটুর কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। কার্টিলেজ ক্ষয় হলে হাড়ের সঙ্গে হাড়ের ঘর্ষণ বাড়ে, যা ব্যথা, শক্তভাব এবং হাঁটু ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যার সৃষ্টি করে।
নারীদের মধ্যে হাঁটুব্যথা বেশি হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শরীরের অতিরিক্ত ওজন। ডা. কিরণ মুখোপাধ্যায় বলেন, বয়স ও দৈর্ঘ্যের অনুপাতে শরীরের ওজন বেশি হলে হাঁটুর ওপর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে পেট ও শরীরের নিম্নাংশে অতিরিক্ত মেদ জমলে হাঁটুর জয়েন্ট দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে। এর সঙ্গে ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা, অতিরিক্ত সিঁড়ি ভাঙা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
হাঁটুব্যথার লক্ষণ অনেক সময় শুরুতে তেমন গুরুতর মনে না হলেও ধীরে ধীরে তা জটিল আকার ধারণ করে। চিকিৎসক জানান, হাঁটু সোজা রেখে হাঁটুতে হাত দিয়ে ভাঁজ করলে যদি কড়মড় শব্দ অনুভূত হয়, তাহলে সেটি সতর্ক সংকেত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্যাল্পেবল ক্রেপিটাস। এ ছাড়া নিচে বসে থাকা অবস্থায় উঠতে কষ্ট হওয়া, সিঁড়ি ভাঙতে সমস্যা হওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় হাঁটার পর হাঁটুতে ব্যথা বাড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সমান রাস্তায় হাঁটতে গেলেও যদি ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হয়, তাহলে বুঝতে হবে আর্থ্রাইটিস অনেকটাই অগ্রসর পর্যায়ে চলে গেছে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিসকে সাধারণত চারটি ধাপে বা গ্রেডে ভাগ করা হয়। ডা. কিরণ মুখোপাধ্যায় বলেন, গ্রেড ওয়ান ও গ্রেড টু পর্যায়ে থাকলে নিয়মিত ওষুধ সেবন, জীবনযাপনে পরিবর্তন এবং সঠিক ব্যায়ামের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এই পর্যায়ে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ব্যথানাশক খেয়ে সাময়িক আরাম পান, কিন্তু এতে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় আরও বাড়ে। গ্রেড থ্রি পর্যায়ে পৌঁছালে হাঁটু বেঁকে যেতে শুরু করে এবং ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে জটিল হলো গ্রেড ফোর বা চূড়ান্ত পর্যায়। এই পর্যায়ে হাঁটুর জয়েন্ট প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। অসহ্য ব্যথায় রোগী অনেক সময় বিছানা থেকে উঠতেও পারেন না। চিকিৎসকের মতে, এই অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে হাঁটুর জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারিই একমাত্র স্থায়ী ও নিরাপদ সমাধান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অনেকেই এখন খুব তাড়াতাড়ি অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যা সব সময় সঠিক নয়। প্রয়োজনের আগে সার্জারি করলে ভবিষ্যতে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
হাড়ের ব্যথা ও আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ছোট বয়স থেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা করলে হাড় ও পেশি শক্ত থাকে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস হাঁটুর জন্য অত্যন্ত উপকারী। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করা উচিত নয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে হালকা নড়াচড়া ও স্ট্রেচিং করলে জয়েন্টে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
খাদ্যাভ্যাসও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার শরীরের ওজন বাড়ায়, যা হাঁটুর ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা জরুরি। দই, শাকসবজি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার হাড়ের জন্য উপকারী। মেনোপজের পর নারীদের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি বেড়ে যায়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসক আরও বলেন, অনেক রোগী কিছুদিন ব্যায়াম করে ব্যথা কমলে ভাবেন ‘ভালো হয়ে গেছে’ এবং ব্যায়াম বন্ধ করে দেন। এটি সবচেয়ে বড় ভুল। ব্যায়াম বন্ধ করলে সমস্যা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়, কখনো কখনো আরও খারাপ আকারে। তাই নিয়মিত ও সঠিক ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নারীদের হাড়ের ব্যথা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং বয়স, হরমোন, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের সম্মিলিত ফল। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। অবহেলা না করে শুরুতেই সতর্ক হলে অনেক নারীই হাঁটুব্যথা ও হাড়ের ক্ষয়ের ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।