প্রকাশ: ১১ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের গুরগাঁওয়ে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা। সম্ভাবনাময় টেনিস খেলোয়াড় রাধিকা যাদব, মাত্র ২৫ বছর বয়সেই প্রাণ হারালেন তার নিজের বাবার হাতে। বৃহস্পতিবার দুপুরে, নিজ বাড়ির অভ্যন্তরে রাধিকাকে গুলি করে হত্যা করেন তার বাবা দীপক যাদব। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু এক প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়কে নিঃশেষ করল না, বরং উন্মোচন করল এক ভেতরের দীর্ঘদিনের মানসিক দ্বন্দ্ব ও পারিবারিক অস্থিরতার করুণ চিত্র।
রাধিকা যাদব এক সময় আইটিএফ (ইন্টারন্যাশনাল টেনিস ফেডারেশন) একক ও দ্বৈত সার্কিটে অংশ নিয়েছিলেন এবং ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলছিলেন আন্তর্জাতিক টেনিসে। খেলোয়াড়ি জীবনের পাশাপাশি তিনি গুরগাঁওয়ে একটি টেনিস একাডেমি গড়ে তোলেন, যেখানে তিনি নিজেই কোচ হিসেবে কাজ করতেন। তরুণ খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে।
ঘটনার দিন, গুরগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ এক তরুণীকে মৃত অবস্থায় আনার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে ছুটে যায়। যদিও হাসপাতালে রাধিকাকে পাওয়া যায়নি, সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার কাকা কুলদীপ যাদব, যিনি পরে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, দীপক যাদব দীর্ঘদিন ধরেই তার মেয়ের একাডেমি চালানো নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি চাইতেন রাধিকা তা বন্ধ করে দিক। একদিকে সামাজিক চাপ, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষদের কটূক্তি দীপকের মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। অনেকেই বলে থাকত, “মেয়ের টাকায় চলছে সংসার, তিনি কিছুই করেন না।” এই ধরনের টিপ্পণিগুলো তাকে দিন দিন ভেঙে দিচ্ছিল।
থানা ইনচার্জ বিনোদ কুমার দেশটির শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেন, “দীপক মানসিকভাবে চরমভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। স্থানীয় লোকজনের বিদ্রুপ তাকে দগ্ধ করছিল। বারবার তিনি মেয়েকে একাডেমি বন্ধ করতে বলেছিলেন। কিন্তু রাধিকা রাজি হননি।”
রাধিকার ক্রীড়াজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি আইটিএফ সার্কিটে ৩৬টি একক ম্যাচ ও ৭টি দ্বৈত ম্যাচ খেলেছেন। তার সর্বশেষ একক ম্যাচ ছিল ২০২৪ সালের মার্চে, এবং দ্বৈত ম্যাচ খেলেন ২০২৩ সালের জুন মাসে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্যুরে তার অংশগ্রহণ কমে এসেছিল, তবে কোচিং ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি নিজের খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাচ্ছিলেন ভবিষ্যতের ক্রীড়াবিদ তৈরির জন্য।
এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী, দীপক যাদব নিজেই পুলিশ হেফাজতে দোষ স্বীকার করে বলেন, “আমি পিছন থেকে তিনটি গুলি চালাই। কারণ সে আমার কথা শোনেনি, একাডেমি বন্ধ করেনি।” এই স্বীকারোক্তি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ নয়, এটি একজন পিতার ভেতরের চাপা ক্ষোভ, সামাজিক অপমান এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর এক ভয়াবহ পরিণতির দলিল।
এই ট্র্যাজেডি আবারও প্রমাণ করে দেয়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিবারিক মূল্যবোধ কতটা গভীরভাবে একজন মানুষের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। আর সেই মানসিক বিকার যখন প্রশমনের পরিবর্তে ক্রমাগত জ্বালানি পায়, তখন তা শেষপর্যন্ত নির্মম ট্র্যাজেডির রূপ নেয়।
রাধিকা যাদবের মৃত্যু ভারতের ক্রীড়াজগতে এক শূন্যতার জন্ম দিলো, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের এভাবে ঝরে যাওয়া শুধু তার পরিবার নয়, পুরো ক্রীড়া জগতের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি। সমাজ ও পরিবারে সুষ্ঠু মানসিক সহাবস্থানের গুরুত্ব কতটা অপরিহার্য, রাধিকাকে হারানোর পর সেটিই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাধিকার অকালপ্রয়াণে ভারাক্রান্ত গুরগাঁওয়ের ক্রীড়ামহল, বন্ধ হয়ে গেছে তার একাডেমির প্রতিদিনের প্রশিক্ষণ। আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে একটাই প্রশ্ন—এই সম্ভাবনা, এই জীবন, এমন করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে দিল কে? শুধুই একজন পিতা, নাকি গোটা সমাজের নীরব সহিংসতা?