স্থল হামলা হলে লাভ দেখছেন ইরানের সাবেক সেনাপ্রধান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ বার
ইরান যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা রেজাই

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইরানের সাবেক সামরিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্য। ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় ও উদ্বেগ দুটোই সৃষ্টি করেছে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল অভিযান চালায়, তাহলে সেটি ইরানের জন্য ‘দারুণ’ হবে। তার এই বক্তব্য যুদ্ধের সম্ভাবনা ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রেজাই, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী পরিচালনা করেছেন, বর্তমানে দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, ইরান শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই, বরং কৌশলগতভাবে সম্ভাব্য সংঘাতকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। রেজাই সতর্ক করে বলেন, ইরানের বন্দরগুলোতে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এখন তাদের আক্রমণের আওতায় রয়েছে। তার ভাষায়, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং সংঘাতকে আরও উসকে দিচ্ছে।

তিনি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নীতির সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর ‘পুলিশ’ হতে চাচ্ছে, যা তাদের দায়িত্ব নয়। তার মতে, একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর এমন ভূমিকা গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতি ও উপস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।

তার আরও একটি মন্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, যেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল অভিযান চালায়, তাহলে ইরান হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে জিম্মি করতে সক্ষম হবে। এমনকি তিনি দাবি করেন, প্রতিটি জিম্মির বিনিময়ে বিপুল অর্থ আদায় করা সম্ভব হবে। এই বক্তব্য শুধু কৌশলগত নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা।

রেজাইয়ের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে যে, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে ভয় পায়, সেখানে ইরান এমন পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত এবং প্রস্তুত। এই মনোভাব ইরানের সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে, যেখানে ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ইরানে ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সংশ্লিষ্ট সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জেরে তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় সামরিক অবরোধ আরোপ করে। বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে রেজাইয়ের বক্তব্য যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার পক্ষে নন। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের ওপর নির্ভর করে। তার এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের অভ্যন্তরে যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে।

একই সঙ্গে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক আলোচনায় আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, কেবল সামরিক শক্তি নয়, অর্থনৈতিক কৌশলও এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে আলোচনার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, রেজাইয়ের বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং ইরানের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এটি এমন একটি কৌশল, যেখানে সম্ভাব্য সংঘাতকে ভয় না পেয়ে বরং তা থেকে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এই ধরনের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে এবং উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপই বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই রেজাইয়ের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের বক্তব্য শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরানের সাবেক সামরিক প্রধানের এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সংঘাত কি এড়ানো সম্ভব, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল পথে এগোচ্ছে। বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপের, যেখানে কূটনীতি ও সামরিক শক্তির সূক্ষ্ম ভারসাম্যই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত