সর্বশেষ :
শিশু রামিসা হত্যা: আদালতে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি বাবার ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল মতিঝিল হজ শেষে দেশে ফিরছেন হাজিরা, এ পর্যন্ত ৪২ জনের মৃত্যু ইথিওপিয়ার নির্বাচনে জয়ী হতে চলেছে আবি আহমেদের দল হিলি স্থলবন্দরের ফোরলেন সড়কের কাজ দ্রুত শুরুর আশ্বাস এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: বিলম্ব ফিসহ ফরম পূরণের সময় বাড়ল গাজা সংকট: মধ্যস্থতায় অচলাবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড় বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরা ইরাক: ২৬ সদস্যের শক্তিশালী দল ঘোষণা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন বাজেটে বড় পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক বিবাদের জেরে গুলিবর্ষণ: সন্দেহভাজনসহ নিহত ৭

গাজা সংকট: মধ্যস্থতায় অচলাবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ৩ বার
গাজা সংকট: মধ্যস্থতায় অচলাবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড়

প্রকাশ: ২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গাজা যুদ্ধ এখন এমন এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শান্তির চেয়ে উত্তেজনাই যেন প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, ধ্বংসযজ্ঞ এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার পর গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে সংশয় ও জটিলতা দানা বেঁধেছে। যুদ্ধবিরতির আলোচনা যখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা, ঠিক তখনই মধ্যস্থতাকারীদের কার্যপদ্ধতি এবং হামাসের অনমনীয় অবস্থানের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে ইসরাইলের সামরিক অভিযান, অন্যদিকে হামাসের নেতৃত্ব নির্বাচনের রাজনৈতিক ডামাডোল—সব মিলিয়ে গাজার সাধারণ মানুষ এক অনিশ্চিত ও বিভীষিকাময় ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

গাজায় চলমান রক্তপাত ও অমানবিক পরিস্থিতির জন্য আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী নিকোলাই ম্লাদেনভকে সরাসরি দায়ী করছে হামাস। সংগঠনটির মুখপাত্র হাজেম কাসেমের অভিযোগ, ম্লাদেনভ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে এমন সব তথ্য উপস্থাপন করছেন যা গাজার প্রকৃত পরিস্থিতিকে আড়াল করে হামাসের বিপক্ষে বিষোদগার করছে। হামাসের মতে, মধ্যস্থতাকারীরা শান্তি ফেরানোর চেয়ে ইসরাইলি এজেন্ডাকে প্রাধান্য দিয়ে হামাসকে নিরস্ত্র করার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি হামাসকে কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, শান্তি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে একটি কার্যকর ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া অন্য কোনো আলোচনা তারা গ্রহণ করবে না। এই শর্ত পূরণ না হলে গাজার পরিস্থিতি কেবল অস্থিতিশীলই হবে না, বরং তা আঞ্চলিক দাঙ্গা আরও উসকে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন।

মিশরের মধ্যস্থতায় যে নতুন আলোচনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে, তার মূল এজেন্ডা হিসেবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে সামনে রাখা হয়েছে। কিন্তু হামাস এই প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয় যেখানে চরমে, সেখানে অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নই আসে না। যুদ্ধবিরতির মূল পরিকল্পনার বিপরীতে গিয়ে নিরস্ত্রীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে তারা শান্তি আলোচনার একটি কৌশলগত প্রতারণা বলে মনে করছে। দুই পক্ষই একে অপরের ওপর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং হামাসও তাদের সশস্ত্র অবস্থান ধরে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই অচলাবস্থার মাঝখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিশ দফা পরিকল্পনার বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে মধ্যস্থতাকারীরা, কিন্তু তা কতটা বাস্তবসম্মত হবে তা নিয়ে সন্দিহান পর্যবেক্ষকরা।

সংঘাতের এই জটিলতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হামাসের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। সংগঠনের শীর্ষ পদের লড়াই এখন বেশ নাটকীয় মোড় নিয়েছে। খলিল আল-হাইয়া ও খালেদ মাশআল—উভয়ই কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত হলেও, গাজার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। একটি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তাদের মতদ্বৈধতা শান্তি আলোচনার গতি কমিয়ে দিচ্ছে। এমন এক সংবেদনশীল সময়ে ইসরাইল দাবি করেছে যে, তারা হামাসের নতুন সামরিক প্রধান মোহাম্মদ ওদেহকে হত্যা করেছে। এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে হামাসের অভ্যন্তরে সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, যা শান্তি আলোচনার মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলবে।

গাজার বাইরে অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবস্থাও বর্তমানে অগ্নিগর্ভ। ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য সেখানে কোনো সীমা মানছে না। নাবলুস ও রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই বাগান ধ্বংস করা, ফসলি জমিতে আগুন ধরানো এবং গবাদিপশুর ওপর হামলা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তুর্মুস আয়া এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করা জমির ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কফর আকাবে টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। জাবাতে বাড়িঘর ভাঙার নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যা সেখানকার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড শান্তি আলোচনার পরিবেশকে আরও বিষিয়ে তুলছে।

গাজা যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন ইউরোপ ও ইসরাইলের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কেও চিড় ধরিয়েছে। ফ্রান্সের মতো দেশ যারা ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইলের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে, তারা এখন কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র প্রদর্শনী ইউরোস্যাটরিতে ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইসরাইলি কোম্পানিগুলো এখন কেবল আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রদর্শন করতে পারবে, যা আগে ছিল না। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ক্ষোভ জানালেও, ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ ইসরাইলের প্রতি ইউরোপের ক্রমবর্ধমান অস্বস্তির প্রতিফলন। লেবানন ও ইরান সংঘাতের পর প্যারিস ও তেল আবিবের সম্পর্কের যে শীতলতা শুরু হয়েছিল, তা এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে।

পরিশেষে বলা যায়, গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ছিল আলোচনার মাধ্যমে একটি মানবিক সমাধানে পৌঁছানো, তখন বিভিন্ন পক্ষের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলছে। সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতার লড়াই ও রাজনৈতিক আধিপত্য যখন প্রাধান্য পায়, তখন শান্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের ব্যর্থতা, হামাসের নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাব গাজার সাধারণ মানুষের জন্য কোনো আশার আলো দেখাতে পারছে না। একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ শান্তি প্রক্রিয়া ছাড়া গাজার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান অসম্ভব। বিশ্ববাসী এখন কেবল তাকিয়ে আছে—কবে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হবে এবং গাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত