প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকার মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকা। ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে হাজারো গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ মানুষ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তাদের কণ্ঠে এখন একটাই দাবি—বর্তমান চেয়ারম্যানের অবিলম্বে অপসারণ এবং ব্যাংকের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা। গ্রাহকদের এই টানা আন্দোলনের ফলে ব্যাংকটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
মঙ্গলবার সকাল নয়টা থেকেই ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা জড়ো হতে থাকেন। আন্দোলনকারীদের স্লোগান ও প্রতিবাদী বক্তব্যে এলাকাটি একসময় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করার পাশাপাশি জলকামান ও সাজোয়া যান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তবে আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ও জমানো আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করছেন। তাদের মতে, ব্যাংকটি যদি আবারও কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে।
সোমবারের বিক্ষোভের রেশ এখনো কাটেনি। সেদিন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছিল বলে গ্রাহক ফোরাম অভিযোগ করেছে। এতে বেশ কয়েকজন গ্রাহক আহত হওয়ার দাবিও করা হয়েছে, যদিও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সরাসরি এই অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সোমবারের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের পূর্বনির্ধারিত সশরীরে পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সেই সভা সম্পন্ন হয়। নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয় এবং আলতাফ হোসাইনকে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে নানা চাপে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং সরকার পর্দার আড়ালে থেকে আবারও বিতর্কিত এস আলম গ্রুপকে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে পুনর্বাসনের চেষ্টা চালাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাসে এই ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের হাতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার পর থেকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, প্রায় ৮৫ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে পাচার করা হয়েছে, যার সাথে ব্যাংকটির তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের যোগসাজশ ছিল। গ্রাহকরা এখন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে নারাজ।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ইসলামী ব্যাংকে বারবার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হলেও স্বস্তি ফিরছে না। প্রথমে সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করা হয়েছিল, কিন্তু তিনিও অনিয়মের অভিযোগে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তীতে অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান দায়িত্ব নিলেও গ্রাহক ফোরাম তার নিয়োগকে মেনে নেয়নি। সবশেষে গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু খুরশীদ আলমের বিগত কর্মজীবন এবং তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শুরু থেকেই গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা সোচ্চার ছিলেন। তারা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের ইসলামী ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে বসানো কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের দাবিগুলো মূলত আমানতকারীদের নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত। তারা কোনোভাবেই চান না যে তাদের কষ্টের টাকায় জমানো আমানত কোনো গোষ্ঠীর লুটপাটের লক্ষ্যবস্তু হোক। ব্যাংকটির ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা যে তলানিতে ঠেকেছে, তা গত দুই দিনের বিক্ষোভই প্রমাণ করে। গ্রাহকদের দাবি, নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম, যিনি ইতোপূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করার সময় বিতর্কিত হয়েছিলেন, তার অধীনে ব্যাংকটি কখনোই স্বচ্ছভাবে চলতে পারবে না। তারা একই সঙ্গে দাবি জানিয়েছেন যেন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা গোপনীয়ভাবে রাতে কোনো বোর্ড সভা আয়োজন না করেন এবং সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখেন।
দেশের বৃহৎ এই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অস্থিরতা শুধু মতিঝিল কেন্দ্রিক নয়, বরং এটি সারা দেশের লাখো গ্রাহকের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ যখন সাধারণ মানুষের জমানো মূলধনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তখন সেই প্রভাব সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ে। ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতির দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রয়োজন। গ্রাহকরা তাকিয়ে আছেন নীতিনির্ধারকদের দিকে—সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আদৌ তাদের দাবিগুলো আমলে নেবে কি না, নাকি এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, একমাত্র স্বচ্ছ নেতৃত্ব ও নিরপেক্ষ নিয়োগের মাধ্যমেই ইসলামী ব্যাংক তার হৃত গৌরব ও গ্রাহকদের আস্থা পুনরায় ফিরে পেতে পারে।