দুই বছরেও আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভ নেই বেরোবিতে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত মুখ শহীদ আবু সাঈদ। পুলিশের গুলির মুখে দুই হাত উঁচু করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার সেই দৃশ্য দেশজুড়ে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই আত্মত্যাগ আন্দোলনকে নতুন গতি দেয় এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। কিন্তু সেই আবু সাঈদের নিজের বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) এখনো তার স্মরণে কোনো স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিমিনার কিংবা জাদুঘর নির্মিত হয়নি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থী, সহযোদ্ধা, পরিবার এবং স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবু সাঈদের নামসংবলিত কয়েকটি ফলক থাকলেও তার আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ করার মতো কোনো স্থায়ী স্থাপনা এখনো গড়ে ওঠেনি। যে স্থানটি একসময় শিক্ষার্থীরা ‘শহীদ আবু সাঈদ চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কাজ শুরু হয়নি।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণে এক হাজার ৯০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে তোরণ, একটি জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ, স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প এবং অন্যান্য স্মারক স্থাপনার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঘোষণার সময় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিনিধিরা এবং আবু সাঈদের বাবা-মাও উপস্থিত ছিলেন। তবে ঘোষণার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কোনো দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতে, সময় যত যাচ্ছে, ততই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধান বাড়ছে। তারা মনে করছেন, একজন জাতীয় বীরের স্মৃতি সংরক্ষণে এমন ধীরগতি গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, যেখানে আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, সেখানে শহীদ আবু সাঈদ তোরণ নির্মাণের কথা ছিল। এর পেছনে জাদুঘর এবং চত্বরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললেও এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

তার ভাষ্য, দুই বছর অতিক্রম করেছে। এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন দেখতে চান তারা। তিনি বলেন, একটি স্মৃতিস্তম্ভ শুধু একজন শহীদকে স্মরণ করার প্রতীক নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই দ্রুত কাজ শুরু করার দাবি জানান তিনি।

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, আবু সাঈদ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক। অথচ তার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিচিহ্ন না থাকা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, গত দুই বছরে শুধু আশ্বাসই মিলেছে, বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি।

তার মতে, বর্তমান সরকারের উচিত দ্রুত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা, যাতে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, স্মৃতি সংরক্ষণ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা অনেক দর্শনার্থীও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে যিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, তার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য স্মারক না থাকা বিস্ময়কর। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর এলাকার জাফরপাড়া গ্রামে আবু সাঈদের কবরের পাশে তার বাবা মকবুল হোসেনও সরকারের প্রতি নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ছেলে হত্যার বিচার দ্রুত কার্যকর হতে দেখাই তার সবচেয়ে বড় চাওয়া। জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি যেন সেই বিচার বাস্তবায়িত হতে দেখতে পারেন, সেটিই তার প্রধান দাবি।

মকবুল হোসেন আরও বলেন, সরকারের কাছে ব্যক্তিগত কোনো দাবি নেই। তবে তিনি চেয়েছিলেন, ছেলের নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হোক। এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আশ্বাস মিললেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার আশা, এ প্রকল্পও দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, রংপুর অঞ্চলে শিল্পায়নের অভাব রয়েছে। কর্মসংস্থানের জন্য এখানকার অনেক মানুষকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। তাই তিনি এ অঞ্চলে বড় শিল্পকারখানা স্থাপনেরও দাবি জানান।

আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ভাইয়ের নামে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে না পেয়ে পরিবার হতাশ। সরকার যেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে পরিবারের পাশাপাশি দেশের মানুষও তার আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দিতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশা পরিবারের রয়েছে। তার বাবার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, জীবদ্দশায় ছেলের হত্যার বিচারের বাস্তবায়ন দেখে যাওয়া।

এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, যে গেটের সামনে আবু সাঈদ নিহত হয়েছিলেন, সেটির নাম ‘আবু সাঈদ গেট’ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষা।

তিনি আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চারটি নতুন আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি হল আবু সাঈদের নামে নামকরণ করা হবে। এছাড়া স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানও চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। সেখানে বর্তমানে থাকা কিছু স্থাপনা অপসারণের পর নির্মাণকাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম সারির এই শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষার্থী, পরিবার এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে। তাদের প্রত্যাশা, ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে আবু সাঈদের আত্মত্যাগকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে ইতিহাস, গণতন্ত্র এবং আত্মত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রতিফলনও নিশ্চিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত