একরাম হত্যা: এক যুগেও শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২৭ বার
একরাম হত্যা: এক যুগেও শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া

প্রকাশ:  ১৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফেনীর বহুল আলোচিত ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যাকাণ্ডের এক যুগ পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি বিচারিক প্রক্রিয়া। ২০১৪ সালের ২০ মে প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু ফেনী নয়, গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ধারালো অস্ত্রের আঘাত, গুলিবর্ষণ এবং পরে গাড়িসহ আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ভয়াবহ সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ঘটনার ১২ বছর পরও উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের শুনানি শেষ না হওয়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন নিহতের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২০ মে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার বাসা থেকে উপজেলা পরিষদের উদ্দেশ্যে রওনা হন একরামুল হক একরাম। পথে শহরের একাডেমি সড়কের বিলাসী সিনেমা হলসংলগ্ন এলাকায় একটি অটোরিকশা দিয়ে তার বহনকারী প্রাইভেট কারের গতিরোধ করা হয়। এরপর পরপর কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সশস্ত্র হামলাকারীরা গাড়িটি ঘিরে ফেলে। চালকসহ অন্য যাত্রীরা প্রাণ বাঁচিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলেও একরাম গাড়ি থেকে বের হতে পারেননি। হামলাকারীরা গাড়ির ভেতরেই তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে। পরে পেট্রল ঢেলে পুরো গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের বড় ভাই জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির নেতা মাহতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনারসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ৩০ আগস্ট পুলিশ ৫৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তদন্ত চলাকালে সোহেল নামে এক আসামি র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ ফেনীর তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১৬ জনকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে অধিকাংশই তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সে সময়ের ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

রায়ের পর আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও আপিল করেন। কিন্তু নানা কারণে সেই শুনানি এখনো শেষ হয়নি। ২০২৪ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকাভুক্ত হলেও পরবর্তীতে বেঞ্চ পুনর্গঠনের কারণে শুনানি আর এগোয়নি। ২০২৫ সালে নতুন বেঞ্চ গঠন করা হলেও মামলাটি এখনো চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩৯ জনের মধ্যে ১৬ জন এখনো পলাতক। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিচার চলাকালে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে যান, অন্যরা শুরু থেকেই গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছেন। ফেনী মডেল থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের অবস্থান শনাক্ত হলে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

অন্যদিকে মামলার বেশ কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপারের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন দণ্ডিত ফেনী কারাগারে থাকলেও বাকিদের কাশিমপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।

এক যুগ পেরিয়ে গেলেও নিহত একরামের পরিবারের সদস্যরা এখনো নিরাপত্তাহীনতার কথা বলছেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকেই একরামের স্ত্রী ও তিন সন্তান ঢাকায় বসবাস করছেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও পলাতক আসামিদের কারণে পরিবার এখনো আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

নিহতের বড় ভাই মোজাম্মেল হক বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং উচ্চ আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। তার ভাষায়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু রায় ঘোষণা নয়, সেটির কার্যকর বাস্তবায়নও প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, একরামের সন্তানরা একদিন তাদের বাবার হত্যার বিচার সম্পন্ন হতে দেখবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বহুল আলোচিত হত্যা মামলাগুলোর বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকলে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারও পূর্ণ ন্যায়বিচার পায় না। তাই আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ফেনীর মানুষও মনে করেন, একরাম হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এক যুগ আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় আজও প্রহর গুনছে নিহতের পরিবার এবং পুরো ফেনীবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত