প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স আবারও বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল আয় ও রাজস্বের পূর্বাভাস দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকেও হতাশাজনক আর্থিক পূর্বাভাস প্রকাশ করায় কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে, যেখানে শুক্রবার বাজার খোলার আগেই নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম ৯ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক আর্থিক পূর্বাভাসে নেটফ্লিক্স যে আয় ও রাজস্বের হিসাব তুলে ধরেছে, তা বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে কম। ফলে প্রযুক্তি খাতের অন্যতম জনপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেটফ্লিক্স এখন আর কেবল নতুন গ্রাহক বাড়ানোর ওপর নির্ভর করছে না। প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপননির্ভর সাবস্ক্রিপশন, লাইভ কনটেন্ট, বিভিন্ন ধরনের প্রিমিয়াম প্যাকেজ এবং ধাপে ধাপে সাবস্ক্রিপশনের মূল্য বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যবহারকারীপ্রতি আয় বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও বাজারে প্রত্যাশিত গতিতে আয় বাড়ছে না।
বর্তমানে ভিডিও স্ট্রিমিং খাতে প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তীব্র। ডিজনি, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, ম্যাক্স, অ্যাপল টিভি প্লাসের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর পাশাপাশি ইউটিউব, টিকটক এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও দর্শকদের সময়ের জন্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকদের বড় একটি অংশ এখন দীর্ঘ সময়ের সিরিজ বা চলচ্চিত্রের পরিবর্তে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে প্রচলিত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষক জেফরি ওলডারজ্যাকের মতে, নেটফ্লিক্সের ব্যবসায়িক গল্পে আগের মতো প্রবৃদ্ধির উত্তেজনা আর দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, নতুন গ্রাহক অর্জনের গতি ধীর হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবহারকারীদের ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, আগামী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি আয় বাড়াতে আবারও সাবস্ক্রিপশনের মূল্য বৃদ্ধি করতে পারে অথবা দর্শকদের আকর্ষণ করতে আরও বড় বাজেটের কনটেন্টে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেটফ্লিক্সের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল মৌলিক কনটেন্ট বা অরিজিনাল প্রোগ্রামিং। ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’, ‘স্কুইড গেম’, ‘ওয়েডনেসডে’, ‘দ্য নাইট এজেন্ট’ কিংবা ‘ব্রিজারটন’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শককে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে চলতি বছর এবং আগামী সময়ে একই মানের নতুন কনটেন্টের সংখ্যা তুলনামূলক কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে ব্যবহারকারী বৃদ্ধির গতি আরও শ্লথ হতে পারে।
নেটফ্লিক্সের শেয়ারের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে সর্বোচ্চ অবস্থানে ওঠার পর থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের মূল্য ইতোমধ্যে ৪৪ শতাংশের বেশি কমে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি উল্লেখযোগ্য পতন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদেও থাকতে পারে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দর্শকসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে। নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দর্শকদের দেখার সময় বা ভিউয়িং ডেটা সম্পর্কিত প্রতিবেদন বছরে দুইবারের পরিবর্তে একবার প্রকাশ করা হবে। কোম্পানির দাবি, এতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করা সহজ হবে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, তথ্য প্রকাশের ব্যবধান বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বিনোদন খাত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট, লাইভ স্ট্রিমিং, শর্ট ভিডিও এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ বিনোদনের জনপ্রিয়তা বাড়ায় দর্শকদের অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে নেটফ্লিক্সসহ সব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মকেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নেটফ্লিক্স যদি শক্তিশালী মৌলিক কনটেন্ট, বিজ্ঞাপননির্ভর সেবা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রাহক বৃদ্ধির গতি বাড়াতে না পারে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, সফল নতুন সিরিজ, বড় ক্রীড়া বা লাইভ অনুষ্ঠান সম্প্রচার এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে কোম্পানিটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন নেটফ্লিক্সের আগামী প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল, নতুন কনটেন্ট কৌশল এবং ব্যবহারকারী বৃদ্ধির পরিসংখ্যানের দিকে। এসব সূচকই নির্ধারণ করবে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি আবারও আগের প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারবে কি না।